RSS

আযানের ঘটনা

04 Dec

আযানের ঘটনা


আযান একটি আহ্‌বান, প্রতিদিন আমরা পাঁচবার শ্রবণ করি। তার ধ্বনি আমাদের অন্তরসমূহকে নাড়া দেয়। আমাদের জীবন্ত করে তুলে, অলসতা দূর করে, উদ্দামতা আনয়ন করে। নিশ্চয় এটা ইসলামের নিদর্শন, তাওহীদের আলামত। আল্লাহ কি চান ? এ প্রশ্নের উত্তর যে জানতে চায়, সে যেন আযানের অর্থ নিয়ে চিন্তা করে। এটা সত্যের আহবান। এ হচ্ছে মুসলমানদের আযান ! আমরা এর ঘটনা জানি ? আমরা জানি কিভাবে আমাদের কাছে এসেছে এ আযান ? কিভাবে মুসলমান এর সন্ধান পেয়েছে ? এবং কিভাবে পৌঁছতে পেরেছে মুসলমানগণ আযান পর্যন্ত ? এ এমন কতগুলো প্রশ্ন, যা আযান প্রেমিক প্রত্যেকটি মানুষের জানা জরুরী। এ আযানের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অন্য জাতির চেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করেছেন। এর জন্য তিনি আমাদেরকে মনোনিত করেছেন, একে তিনি আমাদের আলামত বানিয়েছেন।

ইসলামের শুরুতে সালাতের সময় হলে মুসলমানেরা নিজের পক্ষ থেকে মসজিদে এসে উপস্থিত হত। আযান, আহবান বা অন্য কোন মাধ্যমে ডাকাডাকি ছাড়াই। ইবনে ওমর – রাদিআল্লাহু আনহুমা-  থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেনঃ মুসলমানগণ যখন মদীনায় আগমন করে জড়ো হতেন, সালাতের সময়ের প্রতীক্ষা করতেন। তখন সালাতের জন্য ডাকাডাকি হতো না। একদিন তারা এ নিয়ে আলোচনা করলেন। কেউ বললঃ তোমরা নাসারাদের ন্যায় ঘণ্টার অনুসরণ কর। কেউ বললঃ না, বরং হর্ণ গ্রহণ কর, ইহুদিদের শিঙ্গার ন্যায়। ওমর – রাদিআল্লাহু আনহু-  বললেনঃ একজন লোক পাঠান, সে সালাত সালাত বলে ঘোষণা দেবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে বেলাল, তুমি দাঁড়াও, অতঃপর সালাতের ঘোষণা দাও।” {বোখারিঃ (৫৭৯), মুসলিমঃ (৩৭৭) }

ইবনে খুজাইমা – রাহিমাহুল্ল্লাহ-  স্বীয় গ্রন্থে এ শিরোনামে এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেনঃ এ অধ্যায়ের দলিলের বর্ণনা যে, আযানের প্রচলন হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় হিজরতের পর। তিনি মক্কায় সালাত আদায় করতেন আযান ও ইকামাত ছাড়াই।সহিহ ইবনে খুজাইমাঃ (১/১৮৯)

ইবনে ইসহাক – রাহিমাহুল্লাহ-  বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন লোকেরা কোন আহবান ছাড়াই তার নিকট সময় মত সালাতের জন্য উপস্থিত হতো।শায়খ আলবানী বলেছেনঃ এর সনদটি হাসান। দেখুনঃ ফিকহুস সীরাহঃ (১/১৮১) তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক মহান চিন্তা ছিল, মানুষদের কিভাবে সালাতের জন্য উপস্থিত করা হবে ? অবশেষে আল্লাহর বিধান চলে আসে।

আবু উমাইর বিন আনাস তার কোন আনসারী চাচা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের বিষয় নিয়ে খুব চিন্তা করলেন, এ জন্য তিনি কিভাবে মানুষদের জমায়েত করবেন ? তাকে বলা হলোঃ যখন সালাতের সময় হবে একটি পতাকা উত্তোলন করবেন, এ পতাকা দেখে একে অপরকে আহবান করবে। এ উত্তরে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। অতঃপর তার কাছে হর্ণ বাজানোর কথা বলা হলো। পূর্বে উল্ল্লেখিত বোখারির বর্ণনায় যেরূপ রয়েছে। জিয়াদ বললেনঃ ইহুদিদের হর্ণ। এ উত্তরেও তিনি সন্তুষ্ট হলেন না।

তিনি বললেনঃ এটা ইহুদীদের কর্ম। অতঃপর তাকে ঘণ্টার কথা বলা হলো। তিনি বললেনঃ এটা নাসারাদের কর্ম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ চিন্তায় গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ বিন আবদে রাব্বিহি বাড়ি ফিরলেন, তাকে স্বপ্নে আযান দেখানো হলো। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গমন করলেন এবং তাকে আযান বিষয়ে স্বপ্ন সম্পর্কে সংবাদ দিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, অর্ধ ঘুম ও নিদ্রাবস্থায় ছিলাম, আমার কাছে এক আগমনকারী আসল অতঃপর আমাকে আযান দেখালো। তিনি বলেনঃ ওমরও তার পূর্বে এ স্বপ্ন দেখেছে, তিনি তা বিশ দিন গোপন রাখেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানান। তিনি বললেনঃ তুমি আমাকে কেন সংবাদ দাওনি ?” বললেনঃ আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ আমার আগে বলে ফেলেছে, তাই আমার বলতে লজ্জা বোধ হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে বেলাল, দাঁড়াও, দেখ আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ কি বলে, তুমি তার অনুসরণ কর।তিনি বললেনঃ অতঃপর বেলাল আযান দিল। আবু বিশর বলেনঃ আবু উমাইর আমাকে বলেছে, আনসারগণের ধারণা, সেদিন যদি আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ অসুস্থ না হতেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেই মুয়াযি্‌যন বানাতেন।আবু দাউদঃ (৪৯৮), সহীহ আবু দাউদ লিল আল-বানীঃ (৪৬৮)

এ স্বপ্নের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রভূত আনন্দিত হন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেন, যেরূপ অন্যান্য বর্ণনায় এসেছে। ওমর – রাদিআল্লাহু আনহু-  যখন বেলালের মুখে আযানের ধ্বনি শুনলেন, চাদর হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে উপস্থিত হলেন। আর বললেনঃ হে রাসূল, যে আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ, সে যেরূপ বলেছে আমিও অনুরূপ দেখেছি। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর।আবু দাউদঃ (৪৯৯), শায়খ আলবানী হাদীসটি সহিহ বলেছেনঃ সহিহ আবু দাউদঃ (৪৬৯)

অন্য বর্ণনায় হুবহু আযানের শব্দও বর্ণনা করা হয়েছে। মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হর্ণের ব্যাপারে চিন্তা করছিলেন এবং ঘন্টার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তার কাছ থেকে চলে গেলাম। অতঃপর আব্দুল্লাহকে স্বপ্নে দেখানো হলো। তিনি বলেনঃ আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম দুটি হলুদ জামা গায়ে একটি ঘণ্টা নিয়ে দাঁড়ানো। আমি তাকে বললামঃ হে আল্লাহর বান্দা, তুমি কি ঘণ্টা বিক্রি করবে ? সে বললঃ তুমি এর দ্বারা কি করবে ? আমি বললামঃ সালাতের জন্য আহবান করবো। সে বললঃ আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম জিনিসের কথা বলবো না ? আমি বললামঃ তা আবার কি ? সে বললঃ তুমি বলবেঃ

الله أكبر الله أكبر، الله أكبر الله أكبر.

أشهد أن لا إله إلا الله، أشهد أن لا إله إلا الله.

أشهد أن محمدا رسول الله، أشهد أن محمد رسول الله.

حي على الصلاة، حي على الصلاة.

حي على الفلاح، حي على الفلاح.

الله أكبر الله أكبر.

لا إله إلا الله.

তিনি বলেনঃ আব্দুল্লাহ বের হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলেন, অতঃপর স্বপ্ন সম্পর্কে অবহিত করলেন। বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমি দেখলাম হলুদ জামা গায়ে এক ব্যক্তি একটি ঘণ্টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর তাকে স্বপ্নের বিবরণ শোনালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাদের ভাই একটি স্বপ্ন দেখেছে, তুমি বেলালের সাথে মসজিদে যাও, তার কাছে গিয়ে বল, এবং বেলাল যেন এ শব্দ দ্বারা আহবান করে, কারণ তার আওয়াজ তোমার চেয়ে উচ্চ।তিনি বলেনঃ আমি বেলালের সাথে মসজিদে গেলাম, অতঃপর আমি তার কাছে বলতে লাগলাম, সে তার মাধ্যমে সালাতের আহবান জানাতে লাগল। সে বললঃ ওমর ইবনে খাত্তাব আওয়াজ শোনে বের হয়ে আসলেন, বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ, সে যেরূপ দেখেছে আমিও অনুরূপ দেখেছি। অতঃপর আবু উবাইদ বলেন, আবু বকর হিকমী আমাকে বলেছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ আনসারী এ সম্পর্কে বলেছেনঃ

أحمد الله ذا الجلال وذا الإكـ      رام حمداً على الأذان كثيراً

إذ أتاني به البشير من اللــ        ـه فأكرم به لدي بشيراً

في ليال والى بهن ثلاث                      كلما جاء زادني توقيرا

অর্থঃ {আযানের জন্য আমি আল্লাহর অনেক প্রশংসা করছি, যিনি বড়ত্বের ও সম্মানের অধিকারী। যখন আমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এ নিয়ে সুসংবাদ দাতা আসল, তিনি আমাকে এর মাধ্যমে সুসংবাদ দাতা হিসিবে সম্মানিত করেন। লাগাতার তিন রাতে তিনি আমার কাছে আসেন, যখনই তিনি আসেন আমার সম্মান বৃদ্ধি করেন।}”

ইবনে মাজাহঃ (৭০৬), শায়খ আলবানী হাদীসটি হাসান বলেছেনঃ সহিহ ইবনে মাজাহঃ (৫৮০),

আর (الصلاة خير من النوم) এর সংযোজন হয়েছে বেলাল – রাদিআল্ল্লাহু আনহু- এর পক্ষ থেকে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতি প্রদান করেন। বেলাল – রাদিআল্লাহু আনহু-  থেকে বর্ণিত, “তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সালাতের সংবাদ দিতে আসেন, অতঃপর তাকে বলা হয়, তিনি ঘুমন্ত। ফলে তিনি বলেনঃ (الصلاة خير من النوم) (الصلاة خير من النوم) এরপর থেকে ফজরের আযানে এটা প্রচলিত হয়।ইবনে মাজাহঃ (৭১৬), শায়খ আলবানী হাদীসটি সহিহ বলেছেনঃ সহিহ ইবনে মাজাহঃ (৫৮৬)

এর মাধ্যমেই আমরা আযানের ঘটনা জানতে পারলাম, যা এখনো আমাদের কর্ণসমূহ আন্দোলিত করে। এটা মহান নিআমত, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই, তিনি এর শোকর আদায় করার তাওফীক দান করুন। এবং আযান যেন আমাদের জন্য সংরক্ষণ করেন, যেন আমরা এর মাধ্যমে পূর্ব-পশ্চিম জয় করতে সক্ষম হই। সকল প্রশংসা আল্ল্লাহ তাআলার জন্য নিবেদিত।

সূত্রঃ ইসলাম ‌হাউস

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 4, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: