RSS

অভিবাদন হিসেবে সালাম

05 ডিসে.

অভিবাদন হিসেবে সালাম

 

সালাম শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বিপদ-আপদ বা দোষ ত্রুটি থেকে নিরাপদে থাকা। পবিত্র কুরআন মাজিদে সালাম শব্দটি শান্তি ও নিরাপত্তা অর্থেও ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলামে সালাম একটি দোয়া ও গুরুত্বপূর্ণ এবাদত। মুসলমানরা পরস্পর দেখা-সাক্ষাতের সময় সালাম বিনিময় করেন। ইতিহাসের আলোকে জানা যায়,মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই পরস্পরের সাক্ষাতের সময় উপস্থিতকে স্বাগত জানানোর জন্য বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত হয়ে আসছে। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশে, প্রতিটি সম্প্রদায়ে তাদের নিজ নিজ রুচিবোধ ও সংস্কৃতি অনুযায়ী সে ভাব আদান-প্রদানের পৃথক পদ্ধতি চালু রয়েছে।

সালাম আরবি শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে শান্তি। ইসলাম ধর্মে শব্দটি পরস্পরের মধ্যে সম্মান প্রদর্শনের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বাক্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই সৃষ্টির শুরু থেকেই এ নিয়ম চলে আসছে। আর সমাজবদ্ধভাবে চলতে হলে পরস্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, কথাবার্তা ও ভাবের আদান-প্রদান হয়ে থাকে সালামের মাধ্যমে। সালামের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে মহব্বত, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। অপর দিকে পরিচিত ব্যক্তির সাথে সালাম বিনিময়ে মায়াবী বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়। সামাজিকভাবে সালামের মাধ্যমে পারস্পরিক শত্রুতা দূর হয়,সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে ওঠে, আত্মিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। পবিত্র কুরআন মাজিদে রয়েছে, ‘এটি শ্রবণযোগ্য। কেউ আল্লাহর নামযুক্ত বস্তুগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহভীতি প্রসূত।’ (সূরা হজ, আয়াত-৩২)

‘আস্‌সালামু আলাইকুম’-এর অর্থ ‘আপনার ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।’ সালাম শোনার সাথে সাথে জবাব দেয়া ওয়াজিব। ওজর ব্যতীত দেরি করা মাকরুহ। সালামদাতা সামনে থেকে চলে গেলেও জবাব দেবে এবং বিলম্ব করার কারণে তাওবা ও ইস্তেগফার করবে।

‘যাকে সালাম দেয়া হচ্ছে সে একা হলেও এভাবে সালাম দেবে, ‘আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু..’ এই পুরো বাক্য উচ্চারণ করে সালাম দেয়া উত্তম। জবাবও এই বাক্য উচ্চারণ করে দেবে, ‘ওয়া আলাইকুমুসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।’ হাদিস শরিফে এসেছে, শুধু ‘আস্‌সালামু আলাইকুম’ বললে ১০ নেকি এবং ‘রাহমাতুল্লাহ’ বৃদ্ধি করে বললে ২০ নেকি এবং ‘ওয়া বারাকাতুহু’ বাড়িয়ে বললে ৩০ নেকি পাওয়া যায়। (বোখারি, মুসলিম শরিফ)

সালামের শিষ্টাচার সম্পর্কে আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনুল করিমের মধ্যে ঘোষণা করেছেন ‘আর যখন তোমাদের কেহ সালাম করে তখন তোমরা তার চেয়ে উৎকৃষ্ট বাক্যে সালামের উত্তর দাও। অথবা তার অনুরূপ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে হিসাব নেবেন (সূরা-নিসা, আয়াত-৮৬)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন ‘অতঃপর যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করো, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় পবিত্র দোয়া’ (সূরা নূরঃ আয়াত-৬১)।

হজরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ আমাকে পাঁচটি বিষয়ে নসিহত করেছেন। তার মধ্যে একটি হলো যখন তুমি তোমার ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমার পরিবার-পরিজনদের প্রতি সালাম করবে। কারণ এরূপ সালামের মাধ্যমে তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রহমত নাজিল হবে’ (তিরমিযি-শরিফ)।

নিজের ঘর ছাড়া অন্য কারো গৃহে প্রবেশের ব্যাপারে কুরআনে করিমের ঘোষণা হলো ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ কোরো না যে পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা না করো এবং গৃহবাসীকে সালাম না করো। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা স্মরণ রাখো। তোমরা যদি গৃহে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ কোরো না।’ যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্য অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা করো আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন।’ (সূরা-নূর,আয়াতঃ ২৭-২৮)

পবিত্র কুরআনুল করিমের মধ্যে আল্লাহপাক রাসূল সাঃ’কে উদ্দেশ করে বলেন ‘আমার মুমিন বান্দাগণ যখন আপনার খেদমতে হাজির হবে বা সাক্ষাৎ করবে, তখন আপনি তাদের সালাম করুন এবং বলুন তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য রহমতের ফয়সালা করে দিয়েছেন’ (আল-কুরআন)।

হজরত আবু হোরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাঃ বলেছেন, কম বয়সী বয়োজ্যেষ্ঠকে পথ অতিক্রমকারী উপবিষ্টকে এবং কমসংখ্যক অধিকসংখ্যককে সালাম করবে (বোখারি, মিশকাত শরিফ, পৃষ্ঠা-৩৯৭)।

হজরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা রাসূল সাঃ কিছু বালকের নিকট দিয়ে গমন করলেন এবং তাদের সালাম করলেন’ (বোখারি মুসলিম, মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৯৭)।

হজরত আবু হোরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাঃ বলেছেন, তোমরা ইহুদি-নাসারাদের আগে সালাম দেবে না। (মুসলিম, মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৯৮)।

হজরত জাবের রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘সে ব্যক্তিই অধিক কৃপণ যে সালাম দিতে কার্পণ্য করে।’ (আহ্‌মদ, বায়হাকি, মিশকাত, শো’আবুল ঈমান)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাঃ বলেছেন, আগে সালাম প্রদানকারী গর্ব-অহঙ্কার থেকে মুক্ত (বায়হাকি, শো’ আবুল ঈশান, মিশকাত)।

কোনো ঘর বা কামরা যদি খালি হয়, তবে তাতে প্রবেশ করার সময় এভাবে সালাম করবে, ‘আস্‌সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিচ্ছালিহীন,’ ঘরে যেসব ফেরেশতা ও নেক্কার-জিন্নাত থাকে, তারা এ সালামের জবাব দেয়।

প্রিয় নবী সাঃ এরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমরা মজলিস থেকে বিদায় নেবে তখন মজলিসে উপস্থিত সবাইকে সালাম করবে। কারণ বিদায়ী সালাম প্রবেশের সালাম থেকে উত্তম’ (আল হাদিস)।

যাদের সালাম করা মাকরুহঃ নামাজিকে নামাজের অবস্থায়, তেলাওয়াতকারীকে, যেকোনো প্রকারের জিকরে মশগুল থাকলে, খুতবা পাঠকারীকে চাই তা জুমার খুতবা হোক বা ঈদের বা বিবাহের। হাদিস বা অন্য কোনো শরিয়তের ইলম শিক্ষাদানকারীকে পাঠদানের সময়, বিচারক যখন মকদুম ফয়সালা করার জন্য বসবেন,মুয়াজ্জিনকে আজান দেয়ার সময়, ইকামত বলা অবস্থায়, অপরিচিতা গায়বে মুহরাম, প্রত্যেক প্রকারের ফাসিককে,জুয়াড়ি ও মদ্যপানকারীকে, গীবত করা যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে তাদের, কাফিরকে, পায়খানা-পেশাব করা অবস্থায়, খাদ্য ভক্ষণ করার সময়, মিথ্যুককে, ইচ্ছাকৃতভাবে বেগানা মহিলাদের দিকে দৃষ্টিদানকারীকে, যারা মানুষকে গালিগালাজ করতে অভ্যস্ত তাদের।

যাদের পক্ষে সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব নয়ঃ (১) নামাজরত ব্যক্তি (২) খাদ্য ভক্ষণকারী (৩) পানকারী (৪) দোয়ারত ব্যক্তি (৫) তেলাওয়াতকারী ব্যক্তি (৬) জিকরে মশগুল ব্যক্তি (৭) খুতবা পাঠকারী (৮) তালবিয়া পাঠকারী (৯) পায়খানা-পেশাবরত অবস্থায় (১০) ইকামত দানকারী (১১) আজানদানকারী (১২) নাবালেগ (১৩) মাতাল ব্যক্তি (১৪) অপরিচিতা যুবতী মহিলার সালামের (১৫) ফাসিকের (১৬) তন্দ্রাচ্ছন্ন ব্যক্তির (১৭) ঘুমন্ত ব্যক্তির (১৮) গোসলখানায় থাকাবস্থায় (১৯) বিচারপতির বিচারকার্যে রত থাকাবস্থায় (২০) পাগলের সালামের জবাব দেয়াও ওয়াজিব নয়।

সালাম আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের উত্তম সহায়ক। মুত্তাকিনদের জন্য পরকালীন সুসংবাদরূপে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি কেবল মুসলমানরাই পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান করতে পারবে। অমুসলমানকে সালাম দেয়া বা কোনো অমুসলমানের সালামের জবাব দেয়া জায়েজ নয়। অথচ সম্মানী ব্যক্তি অমুসলমান হলেও তাকে সম্মান করা ইসলামী শিষ্টাচারের অংশ। ‘আদাব’ শব্দের অর্থ সম্মান, শিষ্টাচার জ্ঞাপন। সুতরাং অমুসলমানদের ‘আদাব’ বলা যাবে।

তাই আসুন, সালামের আওয়াজে ইসলামী বিশ্বের ময়দানকে তরঙ্গায়িত করে দুনিয়ার জান্নাতি পরিবেশ গড়ে তুলি আর পরকালেও জান্নাত নিশ্চিত করি।

Advertisements
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: