RSS

পোশাক পরিধানের ইসলামী বিধান

05 Dec

পোশাক পরিধানের ইসলামী বিধান

পোশাক-আশাক,বেশভূষা মূলত মানুষের লজ্জা নিবৃত্তির জন্য, লজ্জা ঢাকার জন্য। আদি যুগের মানুষ গাছের পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকত, কিন্তু যুগের পরিক্রমায় তাতে হয়েছে নানাবিধ পরিবর্ধন, পরিমার্জন, পরিবর্তন। বর্তমানে পৃথিবীতে বিদ্যমান নানা ধর্মমত, যেমন ইসলাম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, হিন্দু, ইহুদি ইত্যাদি। তবে কেবল ইসলামই শুধু ধর্ম নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ একটি জীবন বিধান। কিয়ামত অবধি মানবজীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি সমস্যার সূক্ষ্ম সমাধান ইসলাম দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ ‘আপনি বলুন, আল্লাহ সাজসজ্জাকে হারাম করেছে, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, আপনি বলুন এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্য’( সূরা আল-আরাফঃ ৩২)। আলোচ্য আয়াত থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে,যেকোনো বস্তু হারাম করা কিংবা হালাল করা শুধু আল্লাহরই কর্ম। অন্য কারো হস্তক্ষেপ এতে বৈধ নয়।

বিশ্ব নবী হজরত মুহাম্মাদ সাঃ তিনিও যখন অবস্থাসম্পন্ন হয়েছিলেন তখন মূল্যবান পোশাক পরেছেন। একবার তিনি যখন বাইরে এলেন, তখন দেখা গেল তার গায়ে এমন একটি চাদর শোভা পাচ্ছিল, যার দাম এক হাজার দিনার। অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী অনুসরণীয় মনীষীরাও এমনটি করেছেন, যেমন ইমাম আজম আবু হানিফা রহঃ চার শ’ গিনি মূল্যের চাদর ব্যবহার করেছেন বলে জানা যায়।

এর কারণ হলো নেয়ামত ফুটিয়ে তোলাও একপ্রকার কৃতজ্ঞতা, আর সামর্থø থাকা সত্ত্বেও ছিন্ন মলিন পোশাকে থাকা অকৃতজ্ঞতা। বায়হাকি শরিফে বর্ণিত আছেঃ নবী সাঃ বলেছেন, আল্লাহ তাঁর কোনা বান্দার প্রতি যখন কোনো নেয়ামত প্রদান করেন তখন তিনি সেই নেয়ামতের নিদর্শন সেই ব্যক্তির মধ্যে দেখতে ভালোবাসেন। তাই অবস্থাসম্পন্ন লোক নোংরা-অপরিষ্কার কাপড় পরে থাকুক, আল্লাহর কাছে যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া নিঃসন্দেহে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।

উল্লেখ্য, এখানে দু’টি বিষয় থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। প্রথমত, রিয়া বা লোক দেখানো এবং দ্বিতীয়ত, অহঙ্কার। শুধু নিজেকে জাহির করার জন্য জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করা জায়েজ নেই।

নবী সাঃ বলেছেন, তোমরা খাও, পান করো, পরিধান করো এবং দান করো, তবে অপচয় এবং অহঙ্কার পরিহার করো (বুখারি)। সাইয়্যেদুল মুফাসসির হজরত ইবনে আব্বাস রাঃ বলেছেন, যা ইচ্ছা পরিধান করো, যতক্ষণ না দুটো জিনিস তোমাকে বিভ্রান্ত না করে, অপব্যয় ও অহঙ্কার। বুখারি শরিফে বর্ণিত আছে আল্লাহ সে ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না যে অহঙ্কারের সাথে তার পোশাক টেনে চলে।

রাসূল সাঃ বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন সব সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা অপরের লজ্জাস্থল এবং রেশমি কাপড় পরিধান করা হারাম হওয়া সত্ত্বেও হালাল মনে করবে (আবু দাউদ)। তিনি আরো বলেছেন, যেই ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমি পোশাক পরিধান করল আখিরাতে তার ভাগ্যে তা নেই। (মোত্তাঃ আলাইহি)

উল্লেখ্য, দু’টি জিনিস পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে, যা মহিলাদের জন্য হালাল, তা হলো রেশম ও স্বর্ণ।

ইতঃপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি, অবস্থাপন্ন অবস্থায় সামর্থø অনুযায়ী পোশাক পরাই ইসলামের শিক্ষা, কিন্তু এতে কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘন করার কোনো অবকাশ নেই। কেননা এতে অহঙ্কার পয়দা হবে, যা মানুষকে অধঃপতনের অতল গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আর আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেছেন, অহঙ্কার আমার চাদর, যে ব্যক্তি আমার চাদর ও পরিধেয় ধরে টানাটানি করে তাকে আমি কঠোর শাস্তি দেবো। (মুসলিম-হাদিসে কুদসি)।

বস্তুত পোশাক পরিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো লজ্জা নিবারণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই পোশাক-আশাকের মাধ্যমে যেন তাকওয়া বা খোদাভীতি ফুটে ওঠে সে দিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি।

সাথে সাথে আরেকটি জরুরি বিষয় হলো টাখনুর ওপর কাপড় পরিধান করা। হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন, আল্লাহ কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেবেন না, যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত ইজার ঝুলিয়ে পরে (বুখারি)। জাহিলি যুগের আরবরা টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরাকে নিজেদের বড়ত্ব জাহির করার মাধ্যম মনে করত। একবার হজরত আবু বকর রাঃ রাসূল সাঃ’কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার লুঙ্গির এক পাশ ঝুলে থাকে যদি আমি তাতে গিরা না দিই। নবী করীম সাঃ বললেন, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও, যারা অহঙ্কারবশত এরূপ করে থাকে।

হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে এক ব্যক্তি অহঙ্কারবশত তার ইজার হেলিয়ে যাচ্ছিল, এমতাবস্থায় তাকে মাটিতে এমনভাবে ধসিয়ে দেয়া হলো, ফলে সে কিয়ামত পর্যন্ত জমিনের নিচে তলিয়ে যেতে থাকবে। (বুখারি)

ওলামায়ে মোতাআখখেরিন এবং বর্তমান যুগের নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতে, পোশাক-আশাকের ব্যাপারে চারটি মূলনীতি অনুসরণীয় তা হলো;

গর্ব অহঙ্কার প্রকাশ করা যাবে না।

শালীনতা ফুটে উঠতে হবে।

টাখনুর ওপরে পরিধান করতে হবে।

বিজাতীয়দের অনুসরণ করা যাবে না।

উপরিউক্ত চারটি মূলনীতি সামনে রেখে যেকোনো পোশাক পরলেই তা সুন্নতি পোশাক বলে বিবেচ্য হবে। উল্লেখ্য, একশ্রেণীর মানুষ রয়েছেন, যারা শুধু পাঞ্জাবি কিংবা জুব্বা পরিধান করাকেই শুধু সুন্নতের অনুসরণ বলে মনে করেন এবং বাকি পোশাকগুলো সুন্নতের বরখেলাফ বলে মন্তব্য করেন। অথচ পোশাকের দৃষ্টান্ত অনেকাংশে খাবারের মতো। যেমন রাসূল সাঃ খেজুর, রুটি খেতেন আর তা ছিল আরবের প্রচলিত আঞ্চলিক খাবার এবং তা ছিল আবহাওয়ার সাথে মানানসই। কিন্তু অন্য দেশে তা প্রধান খাবার নয়, বরং বিভিন্ন হালাল খাদ্য; যেমনভাত, ডাল, মাছ ও সবজি ইত্যাদি পরিবেশ, আবহাওয়াভেদে প্রধান খাবার। তাই এগুলো যদি সুন্নতের খেলাফ না হয় তেমনিভাবে পরিবেশ ও আবহাওয়াভেদে অন্যান্য শালীন পোশাক পরাও সুন্নতের বরখেলাফ নয়। মূলত লক্ষ রাখা প্রয়োজন জিনিসটি শরিয়াত কতৃêক নিষেধকৃত কি না। এ মানদণ্ডে যাচাই করেই পোশাক-আশাক, খাবার এবং অন্যান্য জিনিস নির্ধারণ করতে হবে।

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 5, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: