RSS

হিজরি সনের ইতিকথা

05 Dec

হিজরি সনের ইতিকথা


ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মুমিনীন হজরত ওমর রাঃ-এর খিলাফতকাল। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু মুছা আশয়ারি ছিলেন তখন ইরাক ও কুফার গভর্নর। তিনি একদিন খলিফার কাছে আবেদন পাঠালেন, আমিরুল মুমিনীনের কাছ থেকে যেসব রাষ্ট্রীয় ফরমান এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়, তাতে কোনো সন-তারিখ উল্লেখ না থাকায় এটা কোন দিনের আদেশনামা অবগত হওয়া যায় না। ফলে এটা কার্যকর করতে জটিলতায় পড়তে হয়।

খলিফার দরবারে পত্র পৌঁছলে তিনি তা পড়ে অনুধাবন করলেন যে, মুছা আশয়ারি আসলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি কালবিলম্ব না করে কয়েকজন সাহাবি নিয়ে মজলিসে শূরা গঠন করে উল্লিখিত বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। তিনি বললেন, মুসলিম জাতির সুবিধার্থে একটি ইসলামি সন-তারিখ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সবাই এতে সম্মতি দিলেন এবং দিন, তারিখ ও সন নির্ধারণের ব্যাপারে নিজ নিজ অভিমত ব্যক্ত করলেন। কেউ বললেন,প্রিয় নবীর সাঃ আবির্ভাবের মাস থেকে হিজরি সন গণনা শুরু হোক। কেউ বললেন, ইন্তেকালের মাস থেকে। কারো কারো মত ছিল নবুওয়াত প্রাপ্তির মাস থেকে শুরু হোক। বিভিন্ন মতামত শোনার পর হজরত ওমর রাঃ বললেন,নবী সাঃ-এর জন্মগ্রহণের মাস থেকে ইসলামি সন চালু করা যায় না। কারণ খ্রিষ্টানরা হজরত ঈসা আঃ-এর জন্মগ্রহণের মাস থেকে তাদের ঈসায়ী সন শুরু করেছে। এজন্য তাদের সাথে সাদৃশ্য আমাদের উচিত হবে না। আর প্রিয় নবীর সাঃ-এর ওফাত যেহেতু আমাদের জন্য অনেক শোক ও দুঃখের, এমন করুণ স্মৃতি সজীবতা লাভ করলে জাহেলি যুগের অন্ধ প্রথা জীবিত হয়ে উঠবে। আর নবুওয়াতের মাস থেকে শুরু করলেও অসুবিধা দেখা দেবে। কারণ নবী-রাসূলগণের জীবন তো দুই প্রকার শারীরিক জীবন ও আত্মিক জীবন। দুনিয়ায় জন্মগ্রহণের পর থেকে শুরু হয় শারীরিক জীবন, আর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর শুরু হয় আত্মিক বা রূহানি জীবন। নবুওয়াতের সময় থেকে সন গণনার বিষয়টি যদিও খ্রিষ্টানদের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়, তবু খ্রিষ্টানরা যেহেতু হজরত ঈসা আঃ-এর শারীরিক জীবন থেকে ঈসায়ী সন চালু করেছে, তাই রাসূল সাঃ-এর নবুওয়াতী জীবন থেকে হিজরি সন করাটা সমীচীন হবে না।

হজরত ওমর রাঃ-এর কথা শেষ হতেই হজরত ওসমান ও হজরত আলী রাঃ তাঁর কথার প্রতি সমর্থন করে বললেন, আমাদের হিজরি সন স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া জরুরি। তাই ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ মহিমান্বিত ও ঐতিহাসিক ঘটনা হিজরতের সময় থেকে এর গণনা শুরু হোক। হজরত ওমর রাঃ সহ সবার কাছে প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হলো এবং ব্যাপক সাড়া পেল।

মহানবী সাঃ যখন হিজরত করেন, তখন ছিল রবিউল আউয়াল মাস। তা হলে প্রশ্ন জাগে, ওই মাসে হিজরি সন না হয়ে মুহররম মাসে হলো কিভাবে? পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনার মাস বারটি,আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান, সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। (সূরা তওবা-৩৬)

এ আয়াতের চারটি সম্মানিত মাসগুলোকে চিহ্নিত করতে গিয়ে নবী করিম সাঃ বিদায় হজের সময় মিনা প্রান্তরে বলেন, তিনটি মাস হলো জিলকদ, জিলহজ ও মুহররম এবং অপরটি হলো রজব (তাফসির ইবনে কাসির)।

এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ শফী রঃ তার বিখ্যাত গ্রন্থ তাফসিরে মাআরেফুল কুরআনে লিখেছেন, উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, মাসের যে ধারাবাহিকতা ইসলামি শরিয়তে প্রচলিত, তা মানব রচিত নয়, বরং রাব্বুল আলামিন যে দিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সে দিনই মাসের তারতিব ও বিশেষ মাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুম-আহকাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ আয়াত দ্বারা আরো প্রমাণিত হয়, আল্লাহর দৃষ্টিতে শরিয়তের আহকামের ক্ষেত্রে চান্দ্র মাসই নির্ভরযোগ্য। চান্দ্র মাসের হিসাব মতেই রোজা, হজ, জাকাত প্রভৃতি আদায় করতে হয়। তবে কুরআন মজিদ চন্দ্রকে যেমন, তেমনি সূর্যকেও সন-তারিখ ঠিক করার মানদণ্ডরূপে অভিহিত করেছে। অতএব চন্দ্র ও সূর্য উভয়টির মাধ্যমেই সন-তারিখ নির্দিষ্ট করা জায়েজ। তবে চন্দ্রের হিসাব আল্লাহর কাছে অধিকতর পছন্দ। তাই শরিয়তের আহকামকে চন্দ্রের সাথে সংশ্লিষ্ট রেখেছেন। এ জন্য চান্দ্র মাসের হিসাব রাখা ফরজে কেফায়া। সব উম্মত এ হিসাব ভুলে গেলে তারা গোনাহগার হবে। চাঁদের হিসাব ঠিক রেখে অন্যান্য সূত্রের হিসাব ব্যবহার করা জায়েজ আছে।

হজরত মুহাম্মদ সাঃ মক্কা শরিফে ইসলামের দাওয়াত আরম্ভের পর থেকে মুশরিকদের পক্ষ থেকে নানাভাবে নির্যাতিত হন। তারা ইসলামের অনুসারীদের বিদ্রূপ করেছে। রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে নির্যাতনসহ উত্তপ্ত বালুর মধ্যে শুইয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে নির্যাতন করেছে। দিন দিন অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকলে মহানবী সাঃ সাহাবিদের হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দেন। পরপর দুইবার সাহাবারা হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর কুরাইশদের নির্যাতনের মাত্রা অধিক থেকে অধিকতর হতে থাকলে রাসূল সাঃ সাহাবাদের মদিনার দিকে হিজরতের নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশের পর প্রায় দেড় শমুসলমান মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। এ নির্দেশ ছিল মহররম মাসে। এ সময় মুশরিকরা ভাবল, নবীসহ বাকি সাহাবিরাও হিজরত করবেন। তাই তারা রাতের আঁধারে নবী সাঃ-এর বাড়ি ঘেরাও করে তাঁকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করল। মুশরিকদের এ চক্রান্ত আল্লাহপাক নবী সাঃ-কে আগেই অবগত করান। এর কয়েক দিন পর রাসূলে করিম সাঃ বাকি কয়েকজন সাহাবি নিয়ে মাতৃভূমি ত্যাগ করে গভীর রাতে মদিনায় হিজরত করেন। তখন ছিল রবিউল আউয়াল মাস। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাসের ধারাবাহিকতা ও সার্বিক সুবিধার কথা চিন্তা করে মহররমকেই হিজরি সনের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া ইসলামপূর্ব যুগে মহররম মাস আরবে বিশেষ সম্মানিত মাস হিসেবে বিবেচিত ছিল।

হিজরি সন বিশ্ব মুসলিমের ঐতিহ্য। হিজরি সনের তারিখ স্মরণ রাখা, এর দৈনন্দিন জীবনে তা ব্যবহার করার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। কেননা হিজরত ছিল মুসলমানদের গৌরবময় অভিযাত্রার এক বিপ্লবী অধ্যায়। এই হিজরতের মধ্য দিয়েই নিগৃহীত, নির্যাতিত উম্মতে মুহাম্মদী সাঃ একটি আত্মপ্রতিষ্ঠিত জাতিতে পরিণত হতে পেরেছিল।

ঐতিহাসিকদের মতে, ইসলামের ইতিহাস এবং হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবনে হিজরতের গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক হিট্রি বলেন, ‘হিজরতের সাথে সাথে হজরতের মক্কা-জীবনের অবসান হয়ে মদিনা-জীবনের সূচনা হয় এবং এখানেই মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। অবহেলিত নবী হিসেবে তাঁর জন্মভূমিকে পরিত্যাগ করে তাকে গ্রহণীয় শহরে সম্মানিত অতিথি হিসেবে প্রবেশ করান।এই হিজরতের পর থেকেই ইসলাম ধর্ম দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র আরবজাহান মুসলমানদের অধীনে আসে। ইয়াসরিবে ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম করে প্রিয় নবী বিশ্বের ইতিহাসকে নতুনভাবে প্রভাবান্বিত করেন। ইয়াসরিববাসী তাঁর সম্মানার্থে তাদের নগরীর নাম রাখলেন মদিনাতুন্নবী বা নবীর শহর। হজরতের মদিনায় আগমনের সাথে সাথেই মদিনার মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। ইসলামের ইতিহাসে এ ধরনের অপরিমেয় মান, খ্যাতি, ধারাবাহিক সাফল্য ও বিজয় বয়ে আনায় প্রিয়নবী সাঃ-এর সাহাবিরা বুঝেছিলেন এই হিজরতের মর্ম ও গুরুত্ব। সুতরাং তাঁর এই ঐতিহাসিক হিজরতকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রাঃ হিজরি সালের প্রবর্তন করে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।

হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম, যা উপরিউক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট। প্রতি বছর আমরা হিজরি সাল বরণ করি ঠিকই, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও এই পুণ্যময় বর্ষবরণের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না বললেই চলে। এ দেশে দেখা যায় না ১ মহররম উপলক্ষে বিশেষ কোনো উদ্যোগ বা আয়োজন। অথচ দেশের জাতীয় ও দলীয় নানা রকম উৎসব ও দিবস এমনকি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসও খুব ধুমধামের সাথে পালিত হয়। অথচ গুরুত্বের বহুমাত্রিকতা ও বহুমুখিতার তুলনায় অন্য যেকোনো উৎসব বা দিবসের চেয়ে ১ মহররমই ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা মুসলমানদের জীবনে বিপ্লবী পরিবর্তনের বার্তা বয়ে আনে প্রতি বছর ১ মহররম তথা হিজরি নববর্ষ।


Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 5, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: