RSS

হিজাব মেনে চলার ফজিলত

05 ডিসে.

হিজাব মেনে চলার ফজিলত

হিজাব বা পর্দা মুসলমানের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় বিধান। সব নবী-রাসূল আঃ এবং তাদের উম্মতের ওপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পর্দা বা হিজাব পরিধান করা আবশ্যক ছিল। সৃষ্টির শুরু থেকেই পর্দা মানবসভ্যতার প্রধান নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পর্দা মানবজাতির শালীনতাবোধ, উন্নত রুচি এবং সর্বোত্তম আদর্শের পরিচায়ক। মূলত মানবজাতিকে হিজাব বা পর্দা পালনের বিশেষ স্বাতন্ত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন করেই সৃষ্টি করা হয়েছে।

হজরত আনাস বিন মালিক রাঃথেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাঃ খায়বার ও মদিনার মাঝখানে তিন দিন অবস্থান করেন এবং তিনি হজরত সফিয়া রাঃ-এর সাথে বাসর যাপনের ব্যবস্থাসম্পন্ন করেন। আমি মুসলমানদের বিবাহ ভোজের জন্য দাওয়াত দিই। সেই ভোজে না রুটির ব্যবস্থা ছিল, না গোশতের ব্যবস্থা। নবী করীম সাঃ ভোজের জন্য দস্তরখানা বিছানোর নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাতে খেজুর, পনির এবং চর্বি ও মাখন ঢেলে দিলেন। এ ছিল তাঁর বিবাহ ভোজ। মুসলিমরা এ প্রসঙ্গে পরস্পর কথোপকথন করল যে, সে কি নবী করীম সাঃ-এর স্ত্রী না ক্রীতদাসীর মধ্যে গণ্য হবে? অতঃপর তারা চিন্তা করলেন, যদি সফিয়ার জন্য পর্দার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তাকে স্ত্রীর মধ্যে গণ্য করা হবে। আর পর্দা না করা হলে ক্রীতদাসী মনে করা হবে। যখন নবী করীম সাঃ সেখান থেকে রওয়ানা করলেন, হজরত সফিয়ার জন্য উটের পেছনে জায়গা করলেন ও তাঁর ও লোকদের মধ্যে পর্দার ব্যবস্থা করলেন (সহিহ আল-বুখারি, ২য় খণ্ড বিবাহ পর্ব)। বর্ণিত হাদিস থেকে এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জাহিলি যুগে আরব সমাজে পর্দানশীন মহিলাদের বিশেষ সম্মানের অধিকারিণী এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বলে মনে করা হতো।

হিজাবেরউৎপত্তি এবং এর উৎকর্ষ জান্নাতে কিন্তু এর অবনতি বা স্খলন সাধিত হয়েছে এ পৃথিবীতে। মানুষের ওপর শয়তানের প্রথম প্ররোচনা ছিল মানুষকে পর্দাহীন করে ফেলা। শয়তান যা হজরত আদম আঃ ও হজরত হাওয়া আঃ-এর মাধ্যমে আরম্ভ করেছিল। পবিত্র কুরআনে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ‘অতঃপর শয়তান উভয়কে প্ররোচিত করল, যাতে তাদের অঙ্গ, যা তাদের কাছে গোপন ছিল, তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়।’ (আল্‌-আরাফ, আয়াত-২০)

যুগ পরিক্রমায় পর্দার ধারাবাহিক অবনতি সাধিত হয়েছে। প্রথম এ কাজটি করে শয়তান। তার পরে কাবিল, অতঃপর হজরত নূহ আঃ-এর স্ত্রীসহ তার কাওমের নির্লজ্জ মহিলারা। অবনতির ধারা অব্যাহত থাকে হজরত লুত আঃ ও হজরত মূসা আঃ-এর কাওমের মাধ্যমে। ফিরাউন এ বিষয়টিকে আরো জঘণ্যতর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এ ধারা ক্রমাগতভাবে নিুগামী হয়ে আইয়্যামে জাহিলিয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত বিস্তৃতি লাভ করে। বর্বর সমাজের নারীদের বেপর্দার ইতিহাস সবচেয়ে নিকৃষ্টতম এবং কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছে। যেখান থেকে মানবজাতিকে পুনরুদ্ধার করেছেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ।

মহানবী সাঃ মুসলমানদের হিজাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা প্রদান করেছেন। যার বদৌলতে তৎকালীন বিশ্বে নিগৃহীত নারীসমাজ তাদের সম্ভ্রম ও সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু মানবজাতির একটি ঐতিহাসিক স্বভাব হিসেবে আধুনিককালে এসে আবারো পর্দাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হচ্ছে নারীদের সম্মান ও সম্ভ্রমের এ আচরণকে। যে জিনিসটি মানুষের স্বভাব এবং সৃষ্টিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে তা নিয়ে যতই বিতর্ক বা হীনম্মন্যতা পোষণ করা হোক, তা কোনো কালেই মুছে যাওয়ার নয়। সব যুগেই যেমন কিছু মানুষ পর্দাহীন থেকে নিজেদের ঠুনকো আভিজাত্য প্রকাশ করার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত ছিল তেমনি সব যুগেই আবার এমন একদল মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায় যারা পর্দার মাঝে নিজেদের সম্মান ও সম্ভ্রম আবিষ্কারের সর্বদা আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন।

মানুষের রুচি পরিবর্তনশীল কিংবা ব্যক্তিভেদে ভিন্নতর। কিন্তু হিজাবের মৌলিকতা এবং এর সুনির্ধারিত নীতিমালা কোনোভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয়। ইসলামও মানুষের এ রুচির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে কোনো বিশেষ রঙ, চাদর কিংবা কাপড় নির্ধারণ করে দেয়নি। বরং এ বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে যে, ‘অবশ্যই নারী ও পুরুষদের তাদের দেহ (সতর) আবৃত করে রাখতে হবে।’ (আল্‌-আহযাব, আয়াত-৩৪)

পাশ্চাত্যের জৌলুসমাখা সস্তা জীবনবোধ যখন থেকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করেছে তখন থেকে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা পর্দার ব্যাপারে নতুনভাবে বিতর্ক ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে শুরু করে। ভোগ আর বস্তুবাদে বিশ্বাসীরা এমনভাবে নারীদের হিজাব থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, যার ফলে নারীজাতি এখন কেবল ভোগ্যপণ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। উপরন্তু এমন একদল নারী জন্ম দেয়া হয়েছে যারা পর্দাকে নিজেদের স্বাধীনতা ও অধিকার হানির নিয়ামক বলে মনে করে। কিন্তু সময় পেরিয়ে যখন তাদের অনেকেই বুঝতে পেরেছিল যে, তাদের নিঃশেষ করে দেয়ার জন্যই মূলত এমন ষড়যন্ত্রের সূচনা করা হয়েছে তখন তারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। হলিউডের এক সময়ের দুনিয়া কাঁপানো অভিনেত্রী ব্রিজিত বার্দোতোরস্বপ্রকাশিত জবানবন্দী যা পৃথিবীকে নতুন করে হিজাবের আবশ্যকতা সম্পর্কে ভাবতে শেখায়।

আজো সমগ্র বিশ্বময় মুসলিম নারীরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে হিজাব পরিধান করার দরুন নিগৃহীত হচ্ছে। তুরস্কে হিজাব পরা মুসলিম ছাত্রীদের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্যাতন; ফ্রান্স ও ব্রিটেনে শাসকগোষ্ঠীর হিজাববিরোধী মনোভাব নতুনভাবে মুসলিম নারীদের হিজাবে উজ্জীবিত হতে শক্তি জুগিয়েছে। এসব অঞ্চলে দিনে দিনে বাড়ছে হিজাব পরা মুসলিম নারীদের সংখ্যা।

হিজাব পরিহিতা একজন নারীর প্রতি যেকোনো পুরুষের আচরণ অন্য হিজাব পরিধানের প্রতি নারীদের সম্মিলিত একাত্মতা চোখে পড়ার মতো। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিজাব পরিহিতা ছাত্রী বোনদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন করে হিজাব পরিহিতা একজন ছাত্রী বোন হিজাব পরার পর নিজেকে আগের চেয়ে বেশি সম্মানিত বোধ করছেন বলে মতামত ব্যক্ত করতে শুনেছি একটি সেমিনারে। তবে তিনি একটি বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, হিজাব হিসেবে মহিলারা যে বোরখা ব্যবহার করছেন সে সম্পর্কে অনেকেই সাবধান নন। কারো কারো মাঝে বোরখাকে হিজাবহিসেবে ব্যবহার না করে ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা লক্ষণীয়, যা আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়।

বোরখা পরিধান করার ক্ষেত্রে একজন সচেতন মুসলমানের জন্য যেসব বিধান মেনে চলা আবশ্যক সে সম্পর্কে নিমোক্ত ধারণা পাওয়া যায় এ যুগের শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা ইউসুফ আল্‌-কারযাভীর একটি বক্তৃতা থেকে।

তার প্রদত্ত ভাষণ অনুযায়ী-

১. বোরখা এমন হতে হবে যাতে তা মহিলাদের পুরো দেহকে আবৃত করে দেয়।

২. বোরখা এমন কাপড়ের হওয়া চাই যাতে নিচের অংশ দেখা না যায়।

৩. এমন ঢিলেঢালা হবে যাতে শরীরের কোনো অংশ বিশেষভাবে চিহ্নিত না হয়।

৪. মাথার ওপর থেকে বক্ষদেশ এবং গ্রিবাকে আবৃত করে দেয় এমন ওড়না বা চাদর ব্যবহার করা।

৫. বোরখা যেন ফ্যাশনের নিয়তে না হয়।

৬. পুরুষের পোশাকের মতো যেন না হয়।

হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহঃ পর্দার তিনটি স্তর নির্ধারণ করেছেন। যেমন-

১. সর্বনিু স্তরঃ মুখমণ্ডল এবং হাতের কব্জি ছাড়া নারীর সমুদয় দেহ বোরখা দ্বারা আবৃত রাখা।

২. মাধ্যমিক স্তরঃ মুখমণ্ডল, হাত ও পাসহ সব কিছুই বোরখা দ্বারা আবৃত রাখা।

৩. সর্বোচ্চ স্তরঃ মহিলার শরীর পর্দায় আবৃত করার সাথে সাথে তার পরিধেয় বস্ত্রও আবৃত করে রাখা।

তবে এমন কোনো কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি নিজের ওপর আরোপ করা বৈধ হবে না যাতে নিজের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত হয়। এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, হিজাব না পরা যেমন অজ্ঞতা তেমনি এ ব্যাপারে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করাও অনুরূপ অজ্ঞতা।

সর্বপোরি নারীদের পূর্ণাঙ্গ পর্দা পালনে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতে পারেন পুরুষরা। যে কথাটি পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে রাসূল সাঃ! আপনি মুমিনদের বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে।’ (আন-নূর, আয়াত-৩০)। এ বিষয়টি মনে রাখলেই সবার জন্য পর্দা পালন অনেক সহজ হয়ে যায়। সুতরাং আমরা যদি প্রকৃত আত্মসম্মানবোধ অর্জন করতে চাই তাহলে আমাদের হিজাব পরিধান করতে হবে এবং অন্যদের হিজাব পালনের সুযোগ করে দিতে হবে।

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 5, 2010 in ইসলাম

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: