RSS

অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে মহানবী সা:

06 Dec

অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে মহানবী সা:


ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বয়সের প্রত্যেক স্তরেই রয়েছে ইসলামের কালজয়ী আদর্শ। রাসূলে আকরাম সা:-এর সিরাতই তামাম দুনিয়ার আগত-অনাগত সব মানবগোষ্ঠীর জন্য ইহকালে শান্তি ও পরকালে মুক্তির একমাত্র সোপান। ইসলাম আমাদের ধর্মের নাম আর আল কুরআন জীবন গড়ার সংবিধান। বস্তুতপক্ষে এর একটি জাতীয় পরিচিতি, অন্যটি আক্ষরিক মহাগ্রন্থ। আর তার মডেল মহানবীর গোটা জীবনব্যবস্খা। এই সুন্নাহ তথা মহান জীবনাদর্শই আমাদের চলার পথের প্রতিটি ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণযোগ্য। মূলত রাসূলে আকরাম সা:-এর আগমন, মারামারি, হানাহানি, হত্যা, রাহাজানি, সুদ-ঘুষ, ব্যভিচার-ধর্ষণসহ তাবৎ অসৎ কর্মকাণ্ডে সয়লাব হয়ে যাওয়া জাহেলিয়া সমাজকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঢেলে সাজিয়ে একটি শান্তি-শৃঙ্খলাপূর্ণ, সততা-নিষ্ঠা, ভদ্রতা ও শালীনতার গুণে ঋদ্ধ সর্বোপরি মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করে সব ধরনের অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যেই। তাই তো তিনি বলেছেন, ‘উন্নত চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধনের জন্যই আমার আবির্ভাব।

তাওহিদের ডাক : জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাওহিদ তথা আল্লাহপাকের একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহানবী সা: সমাজকে কলুষতামুক্ত করেছেন। কালেমা তাইয়্যেবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ মূলত স্বচ্ছ, পবিত্র ও নজিরবিহীন এক আকিদা। এ আকিদা ব্যক্তির অন্তরে প্রগাঢ় শক্তি ও অটুট বিশ্বাস জাগ্রত করে। পাল্টে দেয় মানুষের চরিত্র। যথার্থ অর্থে আল্লাহর প্রতি ঈমান জনগণের অসৎ মনোবৃত্তি, অস্খির মানসিকতা, তাগুতি শক্তির সেবা দাসত্ব এবং খামখেয়ালিপনার স্খলে নিজেকে আল্লাহর অনুগত দাস হিসেবে সহজ-সরল ও প্রত্যয়ী মানুষে পরিণত করে। জাগ্রত করে জীবনের প্রতি দায়বোধ। ঈমানী চেতনায় সে নিজেকে শিরক, কুফর, ফিসক ও নিফাকির মতো গুরুতর অপরাধ থেকে নিজেকে আত্মরক্ষা করে চলে। তাকওয়া হয়ে যায় তার ভূষণ। এভাবে মহানবী সা: তাওহিদের ডাক দিয়ে বিশ্বাসের আলোকে পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আখিরাতের ভয় প্রদর্শন : আখিরাত মানে পরকাল। পরকাল এক মহাজীবন। আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া কিছুই নয়। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরকালের শুরু আর জান্নাত কিংবা জাহান্নামে গিয়ে তার শেষ। যে আখিরাতকে বিশ্বাস করে না তার নেই কোনো হিসাব-নিকাশের তোয়াক্কা; সে যাচ্ছে তাই করতে পারে। পরকালে জবাবদিহিতার কথা মাথায় থাকলে কোনো মানুষই সত্য-মিথ্যা, বৈধ-অবৈধ যাচাই-বাছাই না করে জীবন কাটাতে পারে না। পরকালে বিশ্বাসীদের এমন মানসিকতা গড়ে ওঠে যে, সে প্রতি মুহূর্তে মনে করে তার প্রতিটি গোপন ও প্রকাশ্য কাজের জন্য তাকে মৃত্যুর পর খোদার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তার প্রতি কথা ও কাজ নির্ভুলভাবে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা লিখিত হচ্ছে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। মৃত্যুর পর মন্দ কাজের জন্য তাকে অবশ্য শাস্তি পেতে হবে। তাই সেসব কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য চেষ্টা করে। ঠিক এর বিপরীত চরিত্র হয় পরকালে অবিশ্বাসীদের। তাদের বিশ্বাস মৃত্যুর পর আর কিছুই নেই। কৃতকর্মের জন্য কখনো জবাবদিহি করতে হবে না। দুনিয়ার জীবনে তারা যদি চরম লাম্পট্য ও যৌন অনাচার করে, তারা যদি দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকে, মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে তাকে যদি পশুর চেয়ে নীচ জীবনযাপন করতে বাধ্য করে তবু তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। তাদের কথা দুনিয়াকে প্রাণভরে উপভোগ করতে হবে। যে পারো খাও দাও ফুর্তি করোএই হলো তাদের নীতি। সাইয়্যেদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মদ সা: কুরআন ও হাদিসের সতর্কতামূলক বাণী শুনিয়ে সব মানুষের অন্তরে পরকালের ভয়ভীতি সৃষ্টি করে একটি গঠনমূলক জবাবদিহি সমাজ উপহার দিয়ে যান।

নৈতিক শিক্ষাদান : সত্য-মিথ্যা, হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায় ও হক-নাহক জানতে হলে আল কুরআন শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর যারা এসবের প্রতি জ্ঞান রাখবে না তাদের পক্ষে যেকোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত করা কোনো ব্যাপারই নয়। তাই আল্লাহপাক জ্ঞানার্জনের উপদেশ দিয়ে আল কুরআনের প্রথম বাণী নাজিল করেছেনপড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহাদয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।সূরা আলাক ১-৫। রাসূলেপাক সা: মদিনায় মসজিদে নববীর এক পাশে ইলমে দ্বীন চর্চা ও গবেষণার জন্য একটি ফিন্স মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তা ছাড়া তিনি একজন যুদ্ধবন্দীর মুক্তিপণ হিসেবে শিক্ষাদানের পদ্ধতি চালু করে মুসলমানদের জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করেছেন। ইসলাম ধর্ম মূলত পুরোটাই জ্ঞানার্জনভিত্তিক পালনীয় ধর্ম। কোনো মুসলমান কিছুতেই অজ্ঞ, মূর্খ,অশিক্ষিত ও অপাঙ্ক্তেয় থাকতে পারে না। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত যে রকম ফরজে আইন বা অবশ্য পালনীয় তদ্রূপ দ্বীন-দুনিয়া সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করাও ফরজে আইন অপরিহার্য কর্তব্য। পেয়ারা নবীর একটি প্রসিদ্ধ হাদিস এ সম্পর্কে অকাট্য দলিল। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরজ।অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও অন্যদের কাছে পৌঁছে দাও।কুরআন ও হাদিসে জ্ঞানার্জনের যে গুরুত্ব ও জ্ঞানীর মর্যাদা তা প্রথমত নৈতিক শিক্ষার প্রতি তাগিদ দানের জন্যই। আর অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন করতে চাইলে নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। এ মর্ম উপলব্ধি করে রাসূল সা: সর্বপ্রথম শিক্ষা বিস্তারের বিহিত পদক্ষেপ নেন এবং এ প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি সফলও হন।

মৌলিক চাহিদা পূরণ : রাসূলে আকরাম সা: প্রবর্তিত ইসলামী সমাজব্যবস্খায় সর্বস্তরের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্খান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চিয়তা ছিল। কোনো মানুষকে অভুক্ত থেকে মরতে হয়নি। মানুষের মৌলিক চাহিদা স্বাভাবিক উপায়ে মেটানো না গেলেই মূলত অপরাধ সংঘটিত হয়। সে জন্য মহানবী সা: তাঁর সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্খায় বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপকরণ সরবরাহে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। নিজে অভুক্ত থেকেছেন, কিন্তু সমাজের লোকদের অভুক্ত থাকতে দেননি। ধনীদের সম্পদে গরিবদের হক নির্ধারণ করে দিয়ে তা সুষ্ঠুভাবে বন্টন করে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে আর গরিবদের চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি,ছিনতাই ও লুটতরাজের প্রয়োজন পড়েনি। তিনি বলেছেন, ‘দারিদ্র্য কখনো কখনো কুফরি পর্যন্ত নিয়ে যায়। তাই কর্মক্ষম ব্যক্তিদের খেটে খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহ জোগাতেন আর যারা অসহায়, নিরুপায় তাদের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভাতার ব্যবস্খা করতেন। তিনি সক্ষম ছেলেমেয়েদের দ্রুত বিবাহ সম্পাদনে সীমাহীন গুরুত্বারোপ করেছেন। যাতে সমাজে ধর্ষণ, ব্যভিচার ও বলাৎকারের মতো জঘন্য অপরাধ রোধ করা যায়। এভাবে তিনি অপরাধপ্রবণতা দূরীকরণে স্বাভাবিকভাবে সচ্ছল ও সম্পদশালী হওয়ার লক্ষ্যে সুদ-ঘুষের দ্বার চিরতরে রুদ্ধ করে ব্যবসায়-বাণিজ্যকে হালাল ঘোষণা দিয়েছেন।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল সা: যে চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ নিয়মাবলি শিক্ষা দিয়েছেন তা পালন করে সমাজকে সুখের নীড়ে পরিণত করা সম্ভব। তিনি যে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্খাপনায় সমাজ থেকে অপরাধ-অসৎ মনোবৃত্তি দূর করেছেন সে পদ্ধতি অবলম্বন করলে এখন সমাজ শান্তিপূর্ণ হবে।

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 6, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: