RSS

আজানের মাহাত্ম্য

06 ডিসে.

আজানের মাহাত্ম্য


কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।

মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর

আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।

কি মধুর আযানের ধ্বনি!

আজানের শব্দগত অর্থ হলো ঘোষণা। শরিয়ত মতে, নির্দিষ্ট কিছু বক্তব্যের মাধ্যমে নামাজের সময় ঘোষণা করা হয়। হিজরি প্রথম বর্ষে মদিনায় হজরত বেলাল রা: কর্তৃক প্রথম আজান দেয়া হয়েছিল। সাধারণত আজান জোরে দেয়া হয়। যেখানে বিদ্যুতের ব্যবস্খা আছে, সেখানে স্পিকারের মাধ্যমে দেয়া হয়; যাতে করে বিশ্বাসীরা তা শুনতে পারে ও নামাজের জন্য মুসলিমদের ধর্মীয় উপাসনালয় মসজিদে আসতে পারে। সাধারণত আজানের কিছু পরে নামাজ শুরু হয়। মূলত ফরজ সালাত বা নামাজের জন্যই আজান দেয়া হয়। নামাজের আগে দ্বিতীয় আহ্বানের মাধ্যমে মূল নামাজ শুরু হয়। এই আহ্বানকে বলা হয় ইকামা।

বিজ্ঞজনরা বলেন, আজান আল্লাহর রাসূল সা: কর্তৃক লিখিত হয়নি, বরং তাঁর একজন সাহাবা (সঙ্গী), একজন মুক্ত ইথিওপিয়ান দাস, যার নাম বেলাল ইবনে রিবাহ রা:, ওই আজানের কথাগুলো পাঠ করেন। মুহাম্মদ সা: পরবর্তী সময়ে আজানকে এবাদতের (ইসলামিক) আহ্বান হিসেবে পছন্দ করেন।

শুক্রবার (সালাতুল জুমুআহ) দুবার আজান দেয়া হয়। প্রথম আজান মানুষকে মসজিদে আসার জন্য; দ্বিতীয় আজান ইমাম (যিনি নামাজের নেতৃত্ব দেবেন) কর্তৃক অনুশাসন বা হিতোপদেশজনিত সাপ্তাহিক বক্তব্য (খুতবা) দেয়ার আগে। নামাজের ঠিক আগে, মুয়াজ্জিন বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ ইকামা দিয়ে মূল নামাজ শুরু করেন।

পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে লক্ষ করুন। জাপান ও ইন্দোনেশিয়া হচ্ছে পৃথিবীর প্রায় পূর্বাংশে। ইন্দোনেশিয়া আড়াআড়িভাবে অনেক লম্বা অংশজুড়ে আছে, যেখানে সময়ের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। ইন্দোনেশিয়ার মূল শহরগুলো হলো জাভা, সুমাত্রা, বর্নিও এবং সাইবিল। সকাল হওয়ার সাথে সাথে সাইবিলে ফজরের আজান শুরু হয়। প্রায় একই সময় জাপানেও নামাজের আজান শুরু হয়। উত্তরে জাপান ও দক্ষিণে ইন্দোনেশিয়ার সাইবিলে হাজার হাজার মুয়াজ্জিন সর্বত্র বিরাজমান ও সর্বেসর্বা আল্লাহর একত্ব ও রাসূল মুহাম্মদ সা:-এর রিসালাতের সাক্ষ্য ঘোষণা করতে শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া সেখান থেকে ধীরে ধীরে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব দিকে ছড়াতে থাকে। ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্ত ও পশ্চিম প্রান্তের সময় ব্যবধান হলো এক ঘন্টা ৩০ মিনিট। এই এক ঘন্টা ৩০ মিনিটে সাইবিলের আজান শেষ হতে না হতে তা জাভা দ্বীপের জাকার্তায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। সুমাত্রা এর পরে একই দায়িত্ব নিয়ে নেয়। এবং লক্ষ করে দেখুন, ইন্দোনেশিয়ায় আজান চলতে চলতেই তা কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হয় এবং শেষ হতে না হতেই তা মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর হয়ে আমাদের ঢাকায় এসে ধ্বনিত হয়। বাংলাদেশে আজান শেষ হতে না হতেই শুরু হয় ভারতে কলকাতা থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত, যদিও বাংলাদেশের আগেই ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম রাজ্যে আজান শুরু হয়ে যায়। এরপর তা কলকাতা থেকে শুরু হয়ে বিহার, উড়িষ্যা, মুম্বাইসহ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে যায়। এর মধ্যে চীনেও আজানের আহ্বান শুরু হয়ে যায়। আবার একই সাথে দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ আর উত্তরে মঙ্গোলিয়া,রাশিয়ায়ও আজান ধ্বনিত হয়। ভারতের শ্রীনগর আর পাকিস্তানের শিয়ালকোটে একই সময় নামাজের আজান দেয়া হয়, একই সময় থাকার কারণে। শিয়ালকোট থেকে কোয়েটা বা করাচি ৪০ মিনিটের পার্থক্য। এই ৪০ মিনিটের মধ্যে সমগ্র পাকিস্তানে আজান ধ্বনিত হয়, আর একই সাথে তা আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও রাশিয়ার অন্যান্য অংশেও ধ্বনিত হতে থাকে। আফগানিস্তান থেকে আজানের ধ্বনি চলমান থাকা অবস্খাতেই তা ওমান, ইরানে শুরু হয়। এখান থেকে এক ঘন্টার ব্যবধানে তা ধ্বনিত হতে থাকে ইরাকের বাগদাদে, সেখান থেকে ইয়েমেন, সৌদি আরবের মক্কা, মদিনা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতে। একইসাথে তা আফিন্সকার সোমালিয়া,ইথিওপিয়া, কেনিয়া ইত্যাদি দেশেও ধ্বনিত হতে থাকে।

এরপর ফজরের আজান শোনা যায় তুরস্ক, মিসর, সুদান, তানজানিয়া ইত্যাদি দেশে। আরো কিছু সময় পরে তা লিবিয়া, আলজেরিয়ায় প্রতিধ্বনিত হয় এবং একই সময়ে উত্তরে ইউরোপিয়ান দেশগুলো ও দক্ষিণ আফিন্সকার দেশে তা শোনা যেতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় আজানের ধ্বনি সমগ্র আফিন্সকা মহাদেশে ছড়িয়ে যায়। ততক্ষণে আল্লাহর একত্ব ও রাসূল সা:-এর নবুওয়াত ঘোষণা প্রায় সাড়ে ৯ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, যখন এই ধ্বনি আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে এসে পৌঁছেছে।

আটলান্টিক মহাসাগরে আজান আসার প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে জাপান ও ইন্দোনেশিয়ায় জোহরের আজানের সময় হয়ে গেছে এবং এটা ঢাকায় আসার আগেই ইন্দোনেশিয়ায় আসরের আজান শুরু হয়ে যায়। আসরের আজান জাকার্তায় পৌঁছতে পারল কি পারল না, সাইবিলে মাগরিবের সময় আসন্ন হয়ে যায়। আর সুমাত্রায় মাগরিরেব সময় শুরু হতে না হতেই সাইবিলে শুরু হয় এশার নামাজের আজান। যখন ইন্দোনেশিয়ার মুয়াজ্জিনরা ফজরের আজান দিচ্ছেন, তখন আফিন্সকার মুয়াজ্জিনরা তাদের এলাকায় দিচ্ছেন এশার আজান।

বিষয়টাকে একটু গভীরভাবে পাঠ ও চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীতে এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যখন পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে হাজার হাজার মুয়াজ্জিন পৃথিবীর বুকে আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলের নবুওয়াত ঘোষণা করছেন।

Advertisements
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: