RSS

আনন্দ উল্লাসের সীমা

06 ডিসে.

আনন্দ উল্লাসের সীমা


ইসলাম মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এতে জীবনের প্রতিটি বিষয় সুবিন্যস্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে মানুষের যা কল্যাণ তা গ্রহণ এবং যা অকল্যাণ তা পরিহার করার জন্য সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ রয়েছে। তাই হাদিস ও মহাগ্রন্থ আল কুরআন গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে দেখা যায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন আল্লাহর নবী এবং সাহাবায়ে কেরাম প্রাণান্তকর চেষ্টা-সাধনা করেছেন। আবার কখনো কখনো নিজেদের একঘেয়েমি বা অবসাদ দূর করার জন্য মাঝে মধ্যে কবিতা পাঠ এবং আমোদ আহ্লাদ করেছেন। কিন্তু এ বিষয়গুলো এমনই যে, এর সীমা খুবই নিয়ন্ত্রিত। এর বাইরে গেলে তা হবে হারাম (নিষিদ্ধ), মাকরুহ (নিন্দনীয়), মাকরুহ তানজিহি অর্থাৎ অনুত্তম। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে গোমরা বা পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সূরা লোকমানঃ আয়াত-৬)। এই আয়াতে এ ধরনের লোকদের এবং এ ধরনের কাজকর্মকে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কাফিররা আল্লাহর বাণী শোনার পরিবর্তে বিভিন্ন কিসসা-কাহিনী সংগ্রহ করত এবং তা তারা নিজেরা শুনতো এবং অন্যদের শুনাতো যাতে মানুষকে ইসলাম থেকে গাফেল করা যায় এবং কুরআন থেকে বিমুখ করা যায়। তারা গায়ক-গায়িকা এনে গানবাজনা করত এবং মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে রাখাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

ক্রীড়া-কৌতুক ও তার সাজসরঞ্জামাদি সম্পর্কে শরিয়তের

বিধানঃ মুস্তাদরাক হাকেমে বর্ণিত হজরত আবু হুরায়রার রেওয়াতে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, ‘পার্থিব সব খেলাধুলা বাতিল, কিন্তু তিনটি বিষয় বাতিল নয়; (১) তীর-ধনুক নিয়ে খেলা, (বর্তমান যুগে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরঞ্জামাদি দিয়ে প্রশিক্ষণ) (২) অশ্বকে প্রশিক্ষণ দানের খেলা, (বর্তমান যুগে বিভিন্ন উন্নত যানবাহন যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়) এবং (৩) নিজের স্ত্রীর সাথে হাস্যরস করা। এ তিন প্রকারের খেলা বৈধ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

যে খেলা দ্বীন থেকে পথভ্রষ্ট হওয়ার অথবা অপরকে পথভ্রষ্ট করার উপায় হয়, তা অবৈধ। যেমন আলোচ্য আয়াতেমানুষকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথা সংগ্রহ করে।যে খেলা আনন্দ অনুষ্ঠান মানুষকে কুফরের দিকে নিয়ে যায় না বা গোমরা করে না তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। অশ্লীল কবিতা, উপন্যাস এবং বাতিলপন্থীদের পুস্তক পাঠ করাও নাজায়েজ বলা হয়েছে।

যেসব সাজসরঞ্জামাদি কুফর অথবা হারাম খেলায় বা আনন্দে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো ক্রয়-বিক্রয় করাও হারাম। তবে শারীরিক ব্যায়াম তথা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অথবা অন্য কোনো ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা লাভের জন্য অথবা কমপক্ষে মানসিক অবসাদ দূর করার জন্য যে খেলা হয় বা আনন্দ অনুষ্ঠান হয় তা শরীয়ত অনুমোদন করে, যদি তাতে বাড়াবাড়ি না করা হয় এবং এতে ব্যস্ত থাকার কারণে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বিঘ্নিত না হয়। আর ধর্মীয় প্রয়োজনের নিয়তে খেলা হলে তাতে সওয়াবও আছে। ইবনে আব্বাস রাঃ-এর বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, ‘মুমিনের শ্রেষ্ঠ খেলা সাঁতার কাটা এবং নারীর শ্রেষ্ঠ খেলা সুতা কাটা।যেসব খেলায় কুফর নেই এবং কোনো প্রকার গোনাহ নেই, সেগুলো মাকরুহ। কারণ, এতে অনর্থক কাজে শক্তি ও সময় বিনষ্ট করা হয়। সহি মুসলিম ও মুসনাদে আহমদে হজরত সালাম ইবনে আকওয়া বর্ণনা করেন, জনৈক আনসারি দৌড়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। প্রতিযোগিতায় কেউ তাকে হারাতে পারত না। তিনি একদিন ঘোষণা করলেন কেউ আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। অতঃপর প্রতিযোগিতায় জয়ী হলাম। এ থেকে জানা গেল দৌড় প্রতিযোগিতা বৈধ। খ্যাতনামা কুস্তিগির রোকানা একবার রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর সাথে কুস্তিতে অবতীর্ণ হলে তিনি তাকে ধরাশায়ী করেন। (আবু দাউদ)। আবিসিনিয়ার কিছু যুবক মদিনা তাইয়্যেবার সামরিক কলা-কৌশল অনুশীলনকল্পে বর্শা ইত্যাদি নিয়ে খেলায় প্রবৃত্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাঃ হজরত আয়েশা রাঃকে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করাচ্ছিলেন। তিনি তাদের বলেছিলেন, খেলাধুলা অব্যাহত রাখো (বায়হাকি, কানজ) কতক রেওয়াতে আরো আছে তোমাদের ধর্মে শুষ্কতা ও কঠোরতা পরিলক্ষিত হোক এটা আমি পছন্দ করি না।

অনুরূপভাবে কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে বর্ণিত আছে, যখন তারা কুরআন ও হাদিস সম্পর্কিত কাজে ব্যস্ততার ফলে অবসন্ন হয়ে পড়তেন, তখন অবসাদ দূর করার জন্য মাঝে মধ্যে আরবে প্রচলিত কবিতা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি দ্বারা মনোরঞ্জন করতেন। এক হাদিসে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা মাঝে মধ্যে অন্তরকে বিশ্রাম ও আরাম দেবে।’ (আবু দাউদ)। এ থেকে অন্তর মস্তিষ্কের বিনোদন এবং এর জন্য কিছু সময় বের করার বৈধতা প্রমাণ হয়।

কিছু খেলা, যেগুলো পরিষ্কার নিষিদ্ধঃ এমন কিছু খেলা রয়েছে যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাঃ বিশেষভাবে নিষিদ্ধ করেছেন,যদিও সেগুলোর কিছু উপকারিতা আছে বলেও উল্লেখ করা হয়, যেমন দাবা ইত্যাদি। এগুলোর সাথে হার-জিত ও টাকা-পয়সার লেনদেন জড়িত থাকলে এগুলো জুয়া, অকাট্য হারাম। অন্যথায় কেবল চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা হলেও হাদিসে এসব খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কিত বিধানঃ কয়েকজন সাহাবি উল্লিখিত আয়াতে লাহওয়াল হাদিসে এর তাফসির করেছেন গানবাজনা করা। অন্য সাহাবিরা ব্যাপক তাফসির করে বলেছেন, আয়াতে এমন যেকোনো খেলা বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে দেয়।

হজরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, আল্লাহতায়ালা মদ, জুয়া, তবলা ও সারেঙ্গি হারাম করেছেন। তিনি আরো বলেন, নেশাগ্রস্ত করে এমন প্রত্যেক বস্তু হারাম। (আহমদ, আবু দাউদ)।

অশ্লীলতা এবং হারাম আনন্দ-উল্লাসের পরিণতিঃ আবু দাউদ, ইবনে মাজা ও ইবনে হাব্বান বর্ণিত হজরত আবু মালেক আশআরির রেওয়াতে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেনঃ আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পাল্টিয়ে তা পান করবে। তাদের সামনে গায়িকারা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান করবে। আল্লাহতায়ালা তাদের ভূগর্ভে বিলীন করে দেবেন এবং কতকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শূকরে পরিণত করে দেবেন।

হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, ‘যখন জেহাদলব্ধ সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করা হবে, যখন গচ্ছিত বস্তুকে লুটের মাল গণ্য করা হবে, জাকাতকে জরিমানার মতো কঠিন মনে করা হবে, যখন পার্থিব সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করা হবে, যখন মানুষ স্ত্রীর আনুগত্য ও মাতার অবাধ্যতা শুরু করবে, যখন বন্ধুকে নিকটে টেনে নেবে এবং পিতাকে দূরে সরিয়ে রাখবে, যখন মসজিদগুলোতে হট্টগোল হবে, যখন পাপাচারী-কুকর্মী ব্যক্তি গোত্রের নেতা হবে, যখন নীচতম ব্যক্তি তার সম্প্রদায়ের প্রধান হবে, যখন দুষ্ট লোকদের সম্মান করা হবে তাদের অনিষ্টের ভয়ে, যখন গায়িকা নারী ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক প্রচলন হবে, যখন মদ্যপান শুরু হবে, যখন মুসলিম সম্প্রদায়ের পরবর্তী লোক পূর্ববর্তীকে অভিসম্পাত করবে, তখন তোমরা প্রতীক্ষা করো একটি লালবর্ণ বায়ুর,ভূমিকম্পের, ভূমিধসের, আকার-আকৃতি বিকৃত হয়ে যাওয়ার এবং কিয়ামতের এমন নিদর্শনগুলোর যেগুলো একের পর এক খসে পড়তে থাকে।

সুতরাং যেকোনো আচার-অনুষ্ঠানে আমাদের নির্ধারিত সীমা সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে যাতে করে পাপ তথা সীমা অতিক্রম করে বাড়াবাড়ির পর্যায় যাতে না যায় এটা অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। আনন্দের নামে কৌতুক করে যাচ্ছেতাই বলা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না

Advertisements
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: