RSS

ইসলামে অর্থনৈতিক বিধানের শ্রেষ্ঠত্ব

06 Dec

ইসলামে অর্থনৈতিক বিধানের শ্রেষ্ঠত্ব


পুঁজিবাদে ঋণ বা বিনিয়োগের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে সুদ। অমুসলিম সমাজে সুদি কারবার ও প্রক্রিয়া বহুল প্রচলিত ও ব্যাপকভাবে বিকশিত। সুদি কারবার লেনদেন প্রক্রিয়ায় দুটি জিনিসের উপস্খিতি লক্ষণীয়। এক. ঋণের জন্য পুঁজি সরবরাহকারী বা বিনিয়োগকারী। দুই. ঋণের অর্থ দিয়ে কারবার বা ব্যবসা পরিচালনাকারী। যে প্রতিষ্ঠান বা যিনি পুঁজি দেন ব্যবসায় লাভ হলো কি লোকসান হলো, তা নিয়ে তার ভাবনার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। ওই প্রতিষ্ঠান বা তিনি পুঁজির ওপর নির্দিষ্ট হারে সুদ পেতে থাকেন। ইসলাম এ ধরনের ব্যবসা সমর্থন করে না এবং ইসলাম এ ধরনের সুদের সব কারবার নিষিদ্ধ করেছে।

ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন : ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্খায় রিবার কোনো স্খান নেই। কেননা ইসলামের বিধান মতে,রিবা সমাজের জন্য একটি বড় অভিশাপ। সুদি ব্যবস্খার কারণে অর্থ একটি শ্রেণীর হাতে এসেই কেবল জমা হয়। এতে অপরিহার্যভাবে একচেটিয়া ব্যবসার সৃষ্টি হয়। সুদ স্বার্থপরতা, লোভ, অবিচার এবং শোষণের জন্ম দেয়। সুদের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা ও জালিয়াতির মতো দুষ্ট ক্ষত সৃষ্টি হয়। এর বিপরীতে ইসলাম মানুষের মধ্যে উন্নত নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলি সৃষ্টির প্রেরণা জোগায়। ইসলাম সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, সামষ্টিক কল্যাণ ও উন্নয়ন,সামাজিক সমৃদ্ধি এবং সুবিচারের ভিত্তি তৈরি করে। তাই সুদকে ইসলাম সম্পূর্ণ হারাম বলে ঘোষণা করেছে।

সম্পদ বন্টন : অর্থনীতিতে সম্পদ বন্টনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অর্থনৈতিক জীবন বিচারে সম্পদ বন্টনের বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিতও বটে। কেননা, এ সম্পদ বন্টনের ইস্যুতেই বিশ্বে ঘটেছে অনেক বিপ্লব। মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল পর্যন্ত এ সম্পদ বন্টন ইস্যু ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিগত কয়েক শতক এ সম্পদ বন্টনকে কেন্দ্র করে অনেক বিতর্ক, কথা ও লেখার মাধ্যমে ব্যাপক প্রক্রিয়ায়ই সৃষ্টি হয়নি, বরং এটাকে কেন্দ্র করে বেশ কতগুলো সশস্ত্র যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছে।

সম্পদ বন্টনের ইসলামী প্রেক্ষিত : সম্পদ বন্টনে ইসলামী ধারণা আলোচনার আগে কয়েকটি বিষয়ের ওপর খানিকটা আলোকপাত করা প্রয়োজন, যেন কাáিক্ষত বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যেতে পারে। ১. অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্ব : এ কথা নি:সন্দেহ যে, ইসলাম সন্ন্যাসজীবনের সম্পূর্ণ বিরোধী। মানুষের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আইনসিদ্ধভাবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হোক এটাই ইসলাম সমর্থন করে। ইসলাম মানুষের উন্নয়নকে সমর্থন করে। তবে তা যেন বেআইনি ও অনৈতিক পথে না হয়, তা নিশ্চিত করতে চায় ইসলাম। ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক তৎপরতাকে যেমন মানবজীবনের একমাত্র প্রধান সমস্যা মনে করে না, তেমনি অর্থনৈতিক উন্নতিকেও মানবজীবনের সব কিছু বলে বিশ্বাস করে না। ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায় দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। এর একটি হলো অর্থনীতি মানুষের জীবনের সর্বশেষ গন্তব্য বা লক্ষ্য কি না তা নিয়ে। আর দ্বিতীয়টি হলো নীতিবোধের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ জীবন গড়া প্রয়োজন কি না সেই প্রশ্নে। এখানেই ইসলামী অর্থনীতি ও প্রচলিত অর্থনীতির মধ্যে ব্যবধান রচিত হয়েছে। জড়বাদী অর্থনীতির মূলকথা হলো জীবিকা হচ্ছে মানবজীবনের মৌল সমস্যা। আর অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে মানবজীবনের সর্বশেষ লক্ষ্য।অন্য দিকে ইসলামী অর্থনীতির ধারণা মতে, ‘জীবিকা মানবজীবনের জন্য প্রয়োজন বটে, তবে তা মানবজীবনের একমাত্র সত্য বলে বিবেচিত নয়।তাই কুরআনে সন্ন্যাসজীবনকে অনুমতি দেয়া হয়নি এবং সেই সাথে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর বদান্যতা তালাশ করো।একই সাথে দুনিয়াবি জীবনের ভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকার জন্য পবিত্র কুরআনে তাগিদ দেয়া হয়েছে। ওপরে বর্ণিত কুরআনের দুটি নির্দেশিকা পরস্পর বিপরীত বলে মনে হতে পারে। অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে, কুরআনের মতে, জীবিকার সব উপায় হলো মানুষের জীবন চলার সাময়িক পাথেয় মাত্র। আর মানুষের আসল গন্তব্য তার আয়ত্তের বাইরে বর্তমান। মানুষের আসল গন্তব্যের সাথে জড়িত হলো তার চরিত্র এবং কর্মের উৎকর্ষ বিধান করা এবং তার মাধ্যমে পরজগতে আনন্দ বা সুখের ভিত রচনা করা। তাই মানুষের প্রকৃত সমস্যা এবং মানবজীবনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো এ দুটি লক্ষ্য অর্জন করা। কোনো মানুষই দুনিয়ার প্রতিবìধকতা অতিক্রম ব্যতিরেকে এ উদ্দেশ্য লাভ করতে পারে না। তাই দুনিয়ায় জীবিকার সìধানে যাবতীয় উপায়-উপকরণের ব্যবহারে মানুষকে তার আসল গন্তব্যের কথা ভুলে গেলে চলবে না। আসল ঠিকানাকে সামনে রেখে মানুষকে চলতে হবে। তাহলেই কেবল সে আল্লাহর বদান্যতা বা সìধান লাভ করবে। ২. সম্পদ ও সম্পত্তির আসল প্রকৃতি : সম্পদ বন্টন সমস্যার সমাধানে অন্য আরো যে একটি প্রাথমিক নীতি, তা হলো সম্পদ সম্পর্কে ইসলামের সঠিক ধারণা অনুধাবন করা। কুরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সম্পদ যে প্রকারেরই হোক না কেন, তার সবই হচ্ছে মহান আল্লাহপ্রদত্ত। আর নীতিগতভাবে সম্পদের মালিক হচ্ছেন মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা। যেকোনো জিনিস বা সম্পদের ওপর আল্লাহর একক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত। তাঁর পক্ষ থেকে মানুষ এ সম্পদ লাভ করে ব্যবহার করার জন্য। কুরআনের ঘোষণা হচ্ছে, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তাদেরকে দান করো।’ (সূরা নূর, আয়াত ৩৩)। কুরআনের এ নীতি অনুযায়ী মানুষ উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় তার শ্রম নিয়োজিত করতে পারে। আর একমাত্র আল্লাহই মানুষের এ প্রচেষ্টাকে সফল ও উৎপাদনকে কবুল করার ক্ষমতা রাখেন। মানুষ কেবল কোনো বীজকে মাটিতে পুঁতে রাখতে পারে এ উদ্দেশ্যে যে, তা থেকে গাছ বা ফসল উৎপন্ন হবে। আর সেই বীজ থেকে অঙ্কুর এবং তারপর কোনো গাছ বা ফসল বের করার কাজটি মানুষের আয়ত্তে নয়। তার দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহর। আল কুরআনে এ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘তারা কি লক্ষ করেনি যে, আমি তাদের জন্য সৃষ্টি করেছি নিজ হাতে সৃষ্ট বস্তুগুলোর মধ্য থেকে চতুষ্পদ জন্তুগুলো? অত:পর তারা এগুলোর মালিক হয়।’ (সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৭১)। এ আয়াত থেকে এটাই প্রমাণ হয়, সম্পদ যে ধরনেই হোক না কেন, তার প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। আর তিনি অনুগ্রহ করে এ সম্পদ মানুষকে দিয়েছেন তা ব্যবহার করা এবং তা আল্লাহর নিয়মানুযায়ী ভোগ করার জন্য। তাই আল্লাহতায়ালা এ অধিকার রাখেন যে,মানুষ আল্লাহর বিধান মতে তাঁরই সম্পদ ব্যবহার করেছে কি না তার জন্য জবাব নিতে।

পুঁজিবাদী অর্থনীতি তাত্ত্বিকভাবে এবং প্রয়োগগতভাবে জড়বাদী বা বস্তুবাদী ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই পুঁজিবাদী ধারণা মতে, সম্পদের একচ্ছত্র মালিক মানুষ। সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার সীমাহীন। তাই সে তার সম্পদকে যেখানে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় ও ব্যবহার করতে পারে। আল কুরআন পুঁজিবাদের এ ধারণাকে প্রচণ্ডভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কুরআন বলেছে, ‘তারা বলল, হে শোয়াজের আপনার নামাজ কি আপনাকে শিক্ষা দেয়, আমরা ত্যাগ করি ওই সব উপাস্যকে, যাদের উপাসনা করে আসছে আমাদের বাপ-দাদারা অথবা আমাদের সম্পদে আমরা ইচ্ছামতো যা কিছু করে থাকি তা ত্যাগ করি? (সূরা হুদ, আয়াত ৮৭)। এখানে হজরত শোয়াজের আ:-এর জাতির লোকেরা সম্পদকে তাদের নিজের বলে মনে করছে এবং তারা সম্পদকে তাদের ইচ্ছামাফিক খরচ করতে পারে বলে দাবি করছে। অথচ সম্পদের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। এখানে পুঁজিবাদের ধারণার মূলে কঠোর আঘাত হেনেছে ইসলাম। অর্থাৎ সম্পদ দেয়ার এবং তা ব্যবহারের পথ বাতলে দেয়ার মালিক আল্লাহ। আবার আল্লাহ সম্পদকে তাঁরই দেয়া সম্পদ বলে ঘোষণা করে সমাজবাদীদের সম্পদের ধারণাকেও নস্যাৎ করে দিয়েছেন। ইসলাম পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মধ্যে তফাৎ : ওপরের আলোচনার আলোকে এখন পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও ইসলামের পার্থক্য সহজেই নিরূপণ করা যায়। পুঁজিবাদে সম্পদের একক ও সীমাহীন মালিকানা মানুষের বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য দিকে সমাজবাদে সম্পদের ওপর ব্যক্তির মালিকানা অস্বীকার করা হয়েছে এবং সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানার অধিকার লাভ করেছে। সম্পদের অধিকার বা মালিকানার ব্যাপারে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের এই প্রান্তিক ধারণার বদলে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধারণার জন্ম দিয়েছে। ইসলাম ব্যক্তি সম্পত্তির মালিকানা সমর্থন করলেও সম্পদের ওপর মানুষের একচ্ছত্র ও শর্তহীন মালিকানাকে অস্বীকার করেছে।

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 6, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: