RSS

খ্রিষ্টীয় বনাম ইসলামি উত্তরাধিকার আইন

06 Dec

খ্রিষ্টীয় বনাম ইসলামি উত্তরাধিকার আইন


বিভিন্ন নারী সংগঠনের অনেক দিনের দাবি হলো বাংলাদেশে সম্পত্তিতে নারীর সম-উত্তরাধিকার প্রচলন করা। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কয়েক বছর বিতর্ক চলছে। মানবাধিকার সংগঠন, এনজিও এবং বাম রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীরা সম-উত্তরাধিকার নীতির পক্ষে। ধর্মীয় বিশ্বাসে ইসলামপন্থী সমিতি, সঙ্ঘ ও রাজনৈতিক দলগুলো এর বিপক্ষে। প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে নারী সংগঠনগুলোর দায়িত্ব হলো নারীদের অধিকার, আইনানুগ স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার চেষ্টা। বিশেষত ১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ আমাকে বেশ নাড়া দেয়। তাই সমাধানের জন্য সঙ্কটগুলোর কারণ অনুসìধানের চেষ্টা করেছি। নারী, সন্তান ও জাতির জন্য কোন উত্তরাধিকার নীতি কল্যাণকর, তা বিবেচনার জন্যে নারী নেত্রীসহ জাতির কাছে প্রাপ্ত তথ্যগুলো (প্রগতিশীল গণতন্ত্র, ১৯৯১) তুলে ধরব।

অর্থনীতিতে আয় বন্টনের অনেক বিধি আছে। কিন্তু সম্পদ বা পুঁজি বন্টনের কোনো বিধি নেই। আধুনিক অর্থনীতির এটা একটা বড় সীমাবদ্ধতা। ধর্মীয় উত্তরাধিকার বিধানগুলোই এখনো পরিবার ও রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত সম্পদ বা পুঁজি বন্টনের জন্য বিশ্বে প্রচলিত বিধান। উত্তরাধিকার বিধান নিছক সম্পত্তি বন্টনের বিধান নয়। পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এর বহুমাত্রিকন্ধ অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আছে। উত্তরাধিকার বিধানের স্বরূপের ওপর পারিবারিক ও রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ভর করে। হিন্দু-বৌদ্ধ, রোমান-ক্যাথলিক, খ্রিষ্টান ও ইসলামি উত্তরাধিকার বিধানগুলো বিশ্বের ইতিহাসে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এগুলোর প্রভাবও পরীক্ষিত। পারিবারিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন এক রকম নয়। তাই পারিবারিক জীবন ও রাষ্টিয় জীবনের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিশ্বে পরীক্ষিত উত্তরাধিকার বিধানগুলোর প্রভাব স্মরণে রাখতে হবে।

হিন্দু-বৌদ্ধ উত্তরাধিকার বিধানে নারীরা অধিকারবঞ্চিত এবং পুরুষের সমাধিকার। এ জন্য হিন্দু-বৌদ্ধ উত্তরাধিকার বিধান ও বৈশিষ্ট্য আধা-গণতান্ত্রিক। এ বিধানে সম্পদ বা পুঁজি বন্টনের ধারা ছেলে-সন্তানের মধ্যে সীমিত থাকে এবং পুরুষ বংশভিত্তিক পেশা গড়ে ওঠে। এ বিধানের জন্য ভারতে বর্ণ বা সামাজিক শ্রেণীভিত্তিক সমাজব্যবস্খার সুদীর্ঘ ধারা। পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ বিধান যেখানে প্রচলিত, সেখানেই কমবেশি সামাজিক শ্রেণীভিত্তিক সমাজব্যবস্খার ধারা সৃষ্টি হয়েছে। পক্ষান্তরে, কেবল একজন পুরুষের উত্তরাধিকারী হওয়ায় রোমান-ক্যাথলিক উত্তরাধিকার বিধান একচেটিয়া বা অগণতান্ত্রিক। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে সন্তানভিত্তিক পরিবার ছাড়া এ বিধানে অন্য সন্তানদের সম্পদহীন করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ বিধান এক দিকে রাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান সম্পদহীন জনগোষ্ঠী, অন্য দিকে সম্পদ বা পুঁজির একচেটিয়ামুখী মালিকানার ধারা দেয়। এ বিধানের ধারাবাহিকতার জন্য ইউরোপে অর্থনৈতিক শ্রেণীভিত্তিক, দাসতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্খা এবং সাম্রাজ্যবাদী ধারা গড়ে উঠেছে। কার্ল মার্ক্সসহ পশ্চিমা দার্শনিকরা এটা শনাক্ত করতে পারেননি।

কনস্টান্টিনোপলের খ্রিষ্ট চার্চের সম-অধিকার দর্শনের ভিত্তিতে প্রণীত খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধান৫৩৪ সালে প্রথম প্রচলিত হয় পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যে। দার্শনিক রুশোর সাম্য ও স্বাধীনতা দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ফরাসি বিপ্লবীরা পরিত্যক্ত খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধান ১৭৯০ সালে আবার চালু করেছিল। ব্রিটিশরা এ খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধান ১৯২৫ সালে চালু করেছে। ইউরোপের অন্য দেশগুলো খ্রিষ্টীয় বা রাষ্ট্রীয় নামে এ বিধান চালু করে। এ বিধানে সম্পদ বা পুঁজির সম-বন্টনের ধারা রয়েছে এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সম-গণতন্ত্রমুখী থাকে। তাই অর্থনৈতিক বা সামাজিক শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্খার ধারা গড়ে ওঠে। তবে এ বিধান বিবাহ বিচ্ছেদ, অবিবাহিতদের সহবাস, সন্তানপালন সঙ্কট, প্রকৃতি বিরোধী সমলিঙ্গে বিবাহ ইত্যাদির বৈধতা দেয়। খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধান চালুর পরে সম-অধিকার দর্শনের ভিত্তিতে নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ অধিকারের বিধানও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যে চালু হয়। প্রজন্ম-উত্তর বিবাহ বিচ্ছেদের বহুমুখী সঙ্কট বাড়তে থাকায় নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের অধিকার সংরক্ষিত করা হয়। তাই খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার সম-গণতান্ত্রিক, কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল, তা বিশ্বে পরীক্ষিত।

ইসলামি উত্তরাধিকার ও বৈবাহিক বিধান পরস্পরের সম্পূরক। আলাদাভাবে বিবেচনা করা হলে উত্তরাধিকার বিধানে নারীদের প্রতি এবং বৈবাহিক বিধানে পুরুষের প্রতি কথিত বৈষম্য আছে বলে মনে হতে পারে। পারিবারিক জীবনে নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পূরক বা নির্ভরশীল সম্পর্ক। প্রাকৃতিক কারণে মহিলাদের বেশি বৈবাহিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক-বাìধব সম্পর্ক অপরিহার্য। অর্ধ-আনুপাতিক উত্তরাধিকার বিধানে নারী-পুরুষের পারিবারিক সম্পর্ক সুষম হয়। এ বিধানে সম্পদ বা পুঁজির সুষম-বন্টনের ধারাসহ অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুষম-গণতন্ত্রমুখী থাকে। তাই এ বিধান এক দিকে রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক বা সামাজিক শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্খার ধারা দেয় । অন্য দিকে বিবাহ বিচ্ছেদ ও সন্তানপালন সঙ্কট থাকে নিুমাত্রায়। অবিবাহিতদের সহবাস বা সমলিঙ্গে বিবাহের অনুমতি ইসলাম দেয় না। তাই ইসলামি উত্তরাধিকার সুষম-গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বলে পরীক্ষিত।

বিবাহ বিচ্ছেদের সাথে উত্তরাধিকার বিধানের সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে গোচর হয় না। উত্তরাধিকার ও বৈবাহিক বিধানগুলো আন্ত:পরিবারের মধ্যে নারী-পুরুষের সম্পূরক সম্পর্কের পারিবারিক-বাìধব পরিবেশ তৈরি করে। সর্বত্র কেবল একমাত্রিক সম-সম্পর্ক তৈরি করায় খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধানে এ পারিবারিক-বাìধব পরিবেশ নিু মাত্রায় থাকে। এ জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের প্রত্যক্ষ কারণগুলো বেশি ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, বহুমাত্রিক সুষম সম্পর্কের সমাহার থাকায় ইসলামি উত্তরাধিকার বিধানে পারিবারিক-বাìধব পরিবেশ থাকে নিু মাত্রায়। এ জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের প্রত্যক্ষ কারণগুলো কম ক্রিয়াশীল থাকে। তাই ইসলামি পারিবারিক বিধান থাকায় বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার ২.৫ শতাংশেরও কম। খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধানের জন্যে ইউরোপ-আমেরিকায় এ হার প্রায় ৫০ শতাংশ। ব্যক্তিগত সম্পদ ও উত্তরাধিকার বিধানের কার্যকারিতা না থাকায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিবারিক-বাìধব পরিবেশ আরো কম থাকে। এ জন্য পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে বিবাহ বিচ্ছেদের হার ছিল ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি।

বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর একটি হলেও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন সমীক্ষা বাংলাদেশকে সবচেয়ে শান্তির দেশহিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত হাজার বছরের সুষম গণতান্ত্রিক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এ দেশে। শান্তির মূলে রয়েছে এটা, যা বিশ্বের সেরা। সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতা থাকায় বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর সুষম-গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি অস্খিমজ্জায়। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূলেও কার্যকর রয়েছে এ স্খিতিশীল সুষম-গণতান্ত্রিক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্খার ভিত্তিমূল। এ সুষম-গণতান্ত্রিক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ও চেতনার পরিপন্থী হওয়ায় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষয়িষäু হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় জীবন এখনো সমৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক না হওয়ায় আমাদের পারিবারিক জীবনও সমৃদ্ধ নয়।

পারিবারিক জীবনে সম্পূরক সদস্য হলেও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের রাষ্ট্রীয় জীবনে নারী-পুরুষ সম-সদস্য ও পরিপূরক। প্রচলিত ধর্মগুলোর বিধানগুলো ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্খা যা রাষ্ট্রব্যবস্খার অংশমাত্র। প্রাচীনকালের ছোট রাজ্যে রাজা ও প্রজা ছিল প্রধানত একক ধর্ম-বর্ণভিত্তিক। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো একাধিক ধর্ম-বর্ণ-আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠীভিত্তিক এবং প্রযুক্তি, পেশা ও আবাসিক কারণে পরস্পর সম্পর্কিত। তাই রাষ্ট্রীয় জীবনের জন্য নারী-পুরুষসহ সকল ধর্ম-বর্ণ-আঞ্চলিক ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান ও বিধানগুলো অপরিহার্য। এ জন্য রাষ্ট্রীয় জীবনে সব ব্যক্তির সাম্য-গণতান্ত্রিক বিধান, গণতন্ত্রমুখী রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান এবং সাম্য-গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্খা প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানে সাম্য-গণতান্ত্রিক বিধান নিশ্চিত হলেও সরকারব্যবস্খা গণতান্ত্রিক এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রমুখী না হওয়ায় আমাদের পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধিশীল। রেমিট্যান্স,অর্থ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের তুলনায় স্খানীয় আয়ের বৃদ্ধি ও সুষম বন্টন না হওয়ায় ভূমি-সম্পদের মূল্য বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সম্পত্তিতে নারীর সম-উত্তরাধিকার প্রসঙ্গটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ । অবশ্য এনজিও আর ইউএনর মাধ্যমে খ্রিষ্টীয় মিশনেরও প্রভাব আছে।

নারীনেত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সাথে কিছু প্রশ্ন রেখে শেষ করব। এক. ইউরোপ-আমেরিকার মতো প্রায় ৫০ শতাংশ বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানপালন সঙ্কট, বিবাহহীন সহবাস ও প্রকৃতিবিরোধী সমলিঙ্গে বিবাহ ইত্যাদি কি নারীদের জন্য বেশি কল্যাণকর? দুই. ৫০ শতাংশ সন্তান সৎ মাতা-পিতা, নানী-দাদী, দত্তক মাতা বা পিতা বা সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্রে লালন-পালন কি সন্তানদের জন্য কল্যাণকর হবে? তিন. ইসলামি উত্তরাধিকার বিধান থেকে নিকৃষ্টতর ও ধর্মীয় কারণে খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধান কি বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী গ্রহণ করবে? চার. ক্যাথলিক-প্রটেস্ট্যান্ট দর্শন-বিধানের সামান্য তারতম্যে ইউরোপে পঞ্চদশ থেকে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে শত বছরের ধর্ম-গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় উত্তরাধিকার বিধান ৯০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রে প্রচলনের চেষ্টায় মৌলবাদ ও জঙ্গীর উথানসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্খিতি কি সঙ্ঘাতময় হবে না?

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 6, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: