RSS

জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা ও ইসলাম

06 ডিসে.

জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা ও ইসলাম


সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্খানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ। চন্দ্রের জন্য আমি বিভিন্ন মনজিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে যে পুরনো খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়, সূর্য নাগাল পেতে পারে না চন্দ্রের এবং রাত্রি অগ্রে চলে না দিনের। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণ করে।সূরা ইয়াসিন (৩৮-৪০), অন্য আয়াতে আছেকল্যাণময় তিনি যিনি নভোমণ্ডলে রাশিচক্র সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে রেখেছেন সূর্য ও দীপ্তিময় চন্দ্র। যারা অনুসìধানপ্রিয় অথবা যারা কৃতজ্ঞতাপ্রিয় তাদের জন্য তিনি রাত্রি ও দিবস সৃষ্টি করেছেন পরিবর্তনশীলরূপে।সূরা আল ফুরকান (৬১-৬২)

সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য নক্ষত্রের উদয়-অস্ত, চন্দ্রের হন্সাস-বৃদ্ধি, দিবারাত্রির পরিবর্তন, বিভিন্ন ঋতুতে ও বিভিন্ন ভূখণ্ডেও দিবারাত্রির হন্সাসবৃদ্ধির বিস্ময়কর ব্যবস্খাপনা, যাতে হাজার বছর ধরে এক মিনিট, এক সেকেন্ডেরও পার্থক্য হয়নি এসব বিষয় দ্বারা ন্যূনতম জ্ঞানবুদ্ধির অধিকারী ব্যক্তি এই বিশ্বাস পোষণ করতে বাধ্য হয় যে, এসব বিজ্ঞজনোচিত ব্যবস্খাপনা আপনা-আপনি চলমান নয়; বরং এর একজন পরিচালক আছেন। কুরআন শুধু এসব বিষয়ে চিন্তাভাবনারই দাওয়াত দেয়, যা সাধারণ চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা দ্বারা অর্জিত হতে পারে। এ কারণেই রাসূলে করিম সা: ও সাহাবায়ে কেরাম রা:গণ মানমন্দির তৈরি করা অথবা এগুলো সংগ্রহ করা এবং আকাশলোকের আকার-আকৃতি নির্ণয় করার প্রতি মোটেও কোনো গুরুত্ব দেননি, সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কিত আয়াতগুলোর চিন্তাভাবনা করার অর্থ যদি এর স্বরূপ,আকার-আকৃতি ও গতির দর্শন জানাই হতো, তবে এর প্রতি রাসূলুল্লাহ সা:-এর গুরুত্ব না দেয়া অসম্ভব ছিল। বিশেষত যখন এসব জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, শিক্ষা ও শেখানোর কাজ দুনিয়াতে তৎকালেও বিদ্যমান ছিল।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক সূর্য আরশের নিচে পৌঁছে সেজদা করে এবং নতুন পরিভ্রমণের অনুমতি প্রার্থনা করে। অনুমতি লাভ করে নতুন পরিভ্রমণ শুরু করে। অবশেষে এমন একদিন আসবে যখন তাকে নতুন পরিভ্রমণের অনুমতি দেয়া হবে না, বরং পশ্চিমে অস্ত গিয়ে পশ্চিম থেকেই উদিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে। এটা হবে কেয়ামত সন্নিকটবর্তী হওয়ার একটি আলামত। তখন তওবা ও ঈমানের দরজা বìধ হয়ে যাবে এবং কোনো গোনাহগার, কাফের ও মুশরিকের তওবা কবুল করা হবে না।

(ইবনে কাসির)

নামাজের ওয়াক্তের পরিচয়, কেবলার দিকনির্ধারণ, বছর, মাস ও দিন-তারিখের সঠিক ধারণা প্রভৃতি বিষয়ের জ্ঞান অঙ্কশাস্ত্রের হিসাবাদির মাধ্যমেও অর্জন করা যায়, কিন্তু শরিয়ত এগুলোর ভিত্তি অঙ্কশাস্ত্রের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণের ওপর রাখার পরিবর্তে সাধারণের প্রত্যক্ষকরণের ওপর রেখেছে। চাঁদের হিসাবে বছর, মাস ও দিন-তারিখ নির্ধারিত হয়,কিন্তু চাঁদ হলো কি হলো না, তার ভিত্তি কেবল চাঁদ দেখা ও প্রত্যক্ষ করার ওপর রাখা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই হজ ও রোজার তারিখ নির্ধারিত হয়।

চাঁদের ক্রমবৃদ্ধি, আত্মগোপন ও উদয়ের রহস্য সম্পর্কে কিছু সাহাবি রাসূলুল্লাহ সা:কে প্রশ্ন করলে, কুরআন তার জওয়াবে বলে : অর্থাৎ আপনি উত্তরে বলুন, চাঁদের এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য মাসের শুরু-শেষ ও দিন-তারিখ জেনে হজের দিন নির্দিষ্ট করা, এ জবাব ব্যক্ত করেছে যে, তোমাদের প্রশ্ন অনর্থক। এ রহস্য জানার ওপর তোমাদের কোনো ইহলৌকিক ও পারলৌকিক বিষয় নির্ভরশীল নয়। তাই তোমাদের ধর্মীয় ও পার্থিব প্রয়োজনের সাথে সম্পর্ক রাখে এমন প্রশ্ন করাই দরকার।

সৃষ্টি জগৎ ও সৃষ্ট বস্তু সম্পর্কিত সর্বপ্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে কুরআন পাকের বিজ্ঞজনোচিত নীতি ও পন্থা এটাই যে, সে প্রত্যেক জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে ততটুকুই গ্রহণ করে ও বর্ণনা করে যতটুকু মানুষের ধর্মীয় ও পার্থিব প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কশীল। যতটুকু সে অনায়াসে অর্জন করতে পারে এবং যতটুকু অর্জনে সে আনুমানিক নিশ্চয়তাও লাভ করতে পারে; যেসব দার্শনিকসুলভ ও অনাবশ্যক আলোচনা গবেষণা সাধারণ মানুষের সাধ্যাতীত যা অর্জন করার পরও অকার্যরূপে বলা যায় না যে, এটাই নির্ভুল; বরং সন্দেহ ও অস্খিরতা আরো বাড়ে কুরআন এ ধরনের আলোচনায় মানুষকে জড়িত করে না। কেননা কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের মনজিলে মকসুদ এসব পৃথিবী ও আকাশস্খ সৃষ্টি জগতের ঊর্ধ্বে স্রষ্টার ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনযাপন করে জান্নাতের চিরস্খায়ী শান্তি ও নেয়ামত অর্জন করা। প্রতি যুগের বৈজ্ঞানিক ও সৌরবিজ্ঞান-বিশারদদের কোনো মতবাদ ও গবেষণাকেই নিশ্চিত ও সর্বশেষ বলা যায় না।

বিভিন্ন নভোচারী ও বৈজ্ঞানিকের বিবৃতি থেকে প্রতীয়মান হয়, এসব প্রচেষ্টা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে সৃষ্টি জগতের গোপন রহস্য ও তার স্বরূপ পর্যন্ত পৌঁছা তো দূরের কথা, সীমাহীন ও অগণিত গ্রহ-উপগ্রহ ও নক্ষত্রের আবর্তনের কথা জেনে মনের উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে যায়। তারা এটা স্বীকার করেছে, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির দ্বারা এগুলো পরিমাপ করা অসম্ভব এবং আমাদের সব প্রচেষ্টা এর মোকাবেলায় যৎসামান্য ও নগণ্য। সারকথা এই, সৃষ্টি জগৎ, নক্ষত্র ও গ্রহ-উপগ্রহের এই ব্যবস্খাপনা আপনা-আপনি নয়; বরং কোনো মহান ও ইন্দ্রিয়বহির্ভূত শক্তির আদেশাধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এ কথাটিই পয়গম্বরগণ প্রথম পদক্ষেপেই সাধারণ মানুষকে বলে দিয়েছিলেন এবং কুরআনপাকের অসংখ্য আয়াতে এর প্রতি বিশ্বাস করার জন্য আকাশ, পৃথিবী, নক্ষত্র ও গ্রহ-উপগ্রহের অবস্খা সম্পর্কে চিন্তাভাবনার দাওয়াত দেয়া হয়েছে।

মানুষের চেষ্টা-সাধনা, চিন্তাগত ক্রমোন্নতি ও বিস্ময়কর আবিষ্কার নি:সন্দেহে স্বস্খানে বৈধ ও সাধারণ দৃষ্টিতে প্রশংসার্হও; কিন্তু চিন্তা করলে দেখা যায় যে ঐন্দ্রজালিকতা দ্বারা মানব ও মানবতার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উপকার হয় না, তা চিন্তাবিদ এবং দার্শনিকদের কাজ হতে পারে না। দেখা দরকার, এত বছরের অক্লান্ত সাধনা,বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, যা অনেক অসহায় মানুষের দু:খ-দুর্দশা লাঘব করার জন্য যথেষ্ট হতো, বহু উৎসব করে চন্দ্রে পৌঁছে সেখানকার মাটি, শিলা কুড়িয়ে এনে মানব ও মানবতার কী উপকার সাধিত হয়েছে? বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনো ক্ষুধায় মরছে, তাদের বস্ত্র ও বাসস্খানের সংস্খান নেই। এই সাধনা ও প্রচেষ্টা তাদের দারিদ্র্য ও বিপদ-আপদের কোনো সমাধান দিতে পেরেছে কি?

এ কারণেই কুরআন ও সুন্নাহ এমন নিষ্ফল কাজে লিপ্ত করা থেকে বিরত থাকে এবং কেবল দুটি দিকের প্রতি লক্ষ করে মানুষকে সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে চিন্তাভাবনার দাওয়াত দেয়। প্রথমত, মানুষ যাতে এসব অত্যাশ্চর্য প্রভাবাদি দেখে সত্যিকার প্রভাব সৃষ্টিকারী ও ইন্দ্রিয়বহির্ভূত শক্তিতে বিশ্বাস স্খাপন করে, যে শক্তি এই ব্যবস্খার পরিচালক তারই নাম আল্লাহ। দ্বিতীয়ত, আল্লাহতায়ালা মানুষের উপকারের জন্য পৃথিবীতে ও আকাশে যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তু গচ্ছিত রেখেছেন। মানুষের কাজ এই যে, জ্ঞান-বুদ্ধি ও চেতনা-সাধনার সাহায্যে এসব বস্তুকে ভূপৃষ্ঠের গোপন ভাণ্ডার থেকে বের করা এবং ব্যবহারের পদ্ধতি শিক্ষা করা। বর্তমান বিজ্ঞানের উন্নতি ও তথ্যানুসìধানকে হুবহু কুরআনের উদ্দেশ্য মনে করা ভুল। তেমনিভাবে কুরআনকে এগুলোর বিরোধী বলাও ভ্রান্ত। সত্য এই যে, কুরআন এসব বিষয় বর্ণনা করার জন্য আগমন করেনি। মানুষের জন্য এগুলো অর্জন করা সহজ নয় এবং মানুষের প্রয়োজনের সাথে এর কোনো সম্পর্কও নেই। কুরআন এসব ব্যাপারে নিশ্চুপ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার দ্বারা কোনো কিছু প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে কুরআনের পরিপন্থী বলা শুদ্ধ নয়। চন্দ্রপৃষ্ঠে পৌঁছা, বসবাস করা, সেখানকার খনিজ দ্রব্যাদি দ্বারা উপকৃত হওয়া ইত্যাদি কোনো বিষয় প্রমাণিত হয়ে গেলে তা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই এবং যে পর্যন্ত প্রমাণিত না হয়, অনর্থক তা নিয়ে ধ্যান-ধারণার জাল বোনা এবং তাতে জীবনপাত করে দেয়াও কোনো বুদ্ধিমত্তা নয়।

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 6, 2010 in ইসলাম

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: