RSS

নারীর চাকরির পরিধি

06 Dec

নারীর চাকরির পরিধি


কর্মক্ষেত্রে মুসলিম নারীর ভূমিকা কেমন হওয়া চাই দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে একটি বহুল আলোচিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চলমান ইস্যু। সমসাময়িক সামগ্রিক পরিস্খিতি পর্যালোচনা করলে এ সম্পর্কে দুটি ধারা পাওয়া যায়। প্রথম পক্ষ প্রগতিশীলতার দাবিদার নারীবাদী পাশ্চাত্যের অনুসারী গোষ্ঠী। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, নারীরা পুরুষের মতোই। সুতরাং তারাও পুরুষের পাশাপাশি যেকোনো ধরনের কর্মক্ষেত্রে কোনোরূপ শর্তারোপ ছাড়াই যোগদান করতে পারবে। এটি তাদের জন্মগত অধিকার। তাই চাকরি-বাকরি থেকে তাদের বঞ্চিত করার অর্থই হচ্ছে তাদের মৌলিক মানবীয় অধিকার হরণ করা এবং দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে অলস ও বেকার বসিয়ে রেখে জাতির সমূহ ক্ষতি সাধন করা।

অপর দিকে যারা খাস ইসলামপন্থী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সরব তারা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নয়, বরং নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ও সনাতনী নিয়মে ওস্তাদের মতের ওপর শ্রদ্ধা রেখে এ ধারণা পোষণ করেন যে, নারী কোনোক্রমেই কোনো চাকরিতে যোগদান করতে পারবে না। বাসা-বাড়িই নারীদের স্খান। সুতরাং এর বাইরে তাদের যেতে দেয়া কিছুতেই সমীচীন হবে না। বস্তুতপক্ষে এ দুটি অভিমতের কোনোটিই ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম নারীদের বল্গাহীন যাচ্ছে তাই জীবন যেমন পছন্দ করে না তেমনি তাদের চার দেয়ালে আটকে রাখাও পছন্দ করে না। বরং ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে কিছু শর্তসাপেক্ষে উপযুক্ত যেকোনো কাজে তারা মনোনিবেশ করতে পারে।

ইসলামে কাজের বিনিময়ে জীবনোপকরণ সংগ্রহকে সীমাহীন গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য জায়গায় এ মর্মে দিকনির্দেশনা রয়েছে। হজরত মিকদাদ রা: মহানবী সা: থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সা: এরশাদ করেন, ‘নিজ হাতে উপার্জন করে খাওয়ার চেয়ে অন্য কোনো উত্তম খাওয়া কেউ খেতে পারে না।এর পরিপ্রেক্ষিতে ইবনে হাজর আসকালানি বলেন, এ হাদিসে নিজ হাতে উপার্জন করে খাওয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। যারা কোনো কিছু অবলম্বন করে আত্মনির্ভরশীল তাদের স্বতন্ত্র মর্যাদা রয়েছে। অনুরূপভাবে হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তির সর্বোৎকৃষ্ট খাবার হচ্ছে যা সে নিজে উপার্জন করে।

নিশ্চয়ই সব নবী ব্যবসায়-বাণিজ্য করে নিজের জীবিকার জন্য উপার্জন করতেন। আল্লাহপাক বলেন, ‘আমি আপনার পূর্বে যেসব রাসূল প্রেরণ করেছি তারা প্রত্যেকে আহার গ্রহণ করতেন এবং বাজারে গমন করতেন।এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসির ইবনে কাসির বলেন, আল্লাহতায়ালা তার প্রেরিত পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের ব্যাপারে বলেন, নিশ্চয়ই তারা বাজারে যেতেন ব্যবসা এবং অন্যান্য উপার্জনের জন্য। আর হালাল রিজিক উপার্জনকারী যেন আল্লাহর পথের মুজাহিদের সমতুল্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ জানেন, তোমাদের মাঝে কেউ কেউ আছে অসুস্খ আর কেউ কেউ আল্লাহর নিয়ামত সংগ্রহে পৃথিবীতে বিচরণশীল আর এমন অনেকে আছে যারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াইরত। তাই কুরআন শরিফের যে অংশ তোমার সহজ মনে হয় তা তেলাওয়াত করো।এ আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবি বলেন, এ আয়াতে আল্লাহপাক মুজাহিদ এবং নিজ ও নিজ পরিজনের ভরণপোষণের জন্য সম্পদ উপার্জনকারীর মাঝে সমতা স্খাপন করেছেন। এ জন্য এটি একটি দলিল যে সম্পদ উপার্জন করা জিহাদের একটি স্তর। যেহেতু আল্লাহপাক এটাকে আল্লাহর পথে জিহাদের সাথে একত্রত করেছেন। যেকোনো পরিশ্রমই কাজ। যে যে পেশায় নিয়োজিত আছে সেটি তার কাজ। আর নারীদের কর্ম হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক ওই প্রচেষ্টা যা সে বাস্তব উপকার লাভের জন্য কর্মক্ষেত্রে চালাতে থাকে।

ইসলামে নারীদের পূর্ণ সম্মান ও বুলন্দ দরজা রয়েছে তা হচ্ছে স্বতন্ত্র মর্যাদা, সংরক্ষিত অধিকার। নারী হচ্ছে পুরুষের অর্ধেক। আর তারা আমাদের মা, বোন, স্ত্রী, সর্বোপরি সমাজের অর্ধেক হচ্ছে তারা। এ মর্মে হজরত উম্মে সালমা রা: থেকে একটি হাদিস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমরা কুরআনে যেভাবে পুরুষের ব্যাপারে পাই সেভাবে নারীদের বেলায় তো নেই। অত:পর আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুসলমান পুরুষ ও নারী এবং বিশ্বাসী নারী-পুরুষ সবাই সমান।

এ আয়াতে শরিয়তের দায়িত্ব পালনসহ সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয় জাতিকে সম্পূর্ণ সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাওয়াব ও যেকোনো প্রতিদানপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এমনকি বিচারের রায় পাওয়ার বেলায়ও সমান। অনুরূপভাবে আল্লাহপাক বলেন, ‘যে সৎ কাজ করবে সে পুরুষ হোক কিংবা নারী হোক সে অবশ্যই মুমিন, আমরা তাকে উত্তম হায়াত দান করব এবং তাদের এসব সৎ গুণাবলির জন্য আমরা তাকে উৎকৃষ্ট প্রতিদানে ভূষিত করব।

ইসলাম নারীদের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। ঘরে-বাইরে নারীদের দায়িত্ব রয়েছে। যেমন তারা ঘরের দায়িত্বশীল, সন্তান-সন্ততি লালন-পালনের ভারপ্রাপ্ত এবং বৃহত্তম সমাজ গঠনে সহায়কশক্তি। বুখারি ও মুসলিম শরিফে রয়েছে, ‘নারীরা স্বামীর ঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং তারা এ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।

তাই ইসলামী শরিয়ত একটি সার্বজনীন বিধান। এ বিধান কাউকে চাকরি ও উপার্জন প্রচেষ্টা থেকে বাধা দেয় না। কিন্তু শরিয়ত একটি সীমারেখা পেশ করেছে। আর এসব সীমারেখা মেনে চলা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য উপকারী। সে জন্য ইসলামে নারী-পুরুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গত দায়িত্ব বন্টন করলে নিরাপদ পরিবার গঠন করা যায়। পুরুষ পরিবারের ভরণপোষণ নির্বাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত। আর স্ত্রী ঘর গোছানো এবং সন্তানাদি দেখভালের দায়িত্ব পালন করবে। এ মৌলিক দায়িত্ব ছাড়াও স্ত্রী একান্ত পারিবারিক প্রয়োজনে অথবা স্বাবলম্বী হওয়ার নিয়তে আয়-উপার্জনের লক্ষ্যে কোনো পেশা গ্রহণ করতে পারে। তবে অবশ্যই তাকে কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে, যা তার নিজেরই জন্য সুবিধাজনক এবং নিরাপত্তা বিধায়ক। এসব শর্ত মেনে চললে কোনো অনাকাáিক্ষত পরিস্খিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তা হচ্ছে

১. স্বামীর ঘরের তত্ত্বাবধান, তার আমানত হেফাজত এবং তার সন্তান-সন্ততি লালন-পালনই মহিলার প্রধান কাজ। এ কাজে ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবং স্বামী কিংবা অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে বাইরে কোনো পেশা নেয়া যাবে না। পরিবার ও কর্মস্খলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে।

২. কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো পেশা গ্রহণ করা যাবে না এবং চাকরি করতে গিয়ে শরিয়তের কোনো বিধান লিক্ষত হচ্ছে কি না সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সুদি ব্যাংক পুরুষের সাথে অবাধে আনাগোনা করতে হয়, এমন কোনো পেশা তাদের জন্য সমীচীন নয়।

৩. পেশা হতে হবে নারীর শারীরিক ও মানসিক শক্তিসাপেক্ষে। যেখানে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় ও পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা দিয়ে কাজ করতে হয় সেখানে নারী চাকরি করা কঠিন। তাদের জন্য ইসলামী দাওয়াত প্রচার, শিক্ষকতা,গবেষণা, ডাক্তারি, গৃহপরিচারিকা, কুটির শিল্পের কাজ, কাপড় সেলাই প্রভৃতি কর্মক্ষেত্র সুবিধাজনক।

৪. শালীন ও মার্জিত তথা ইসলামী শরিয়তসম্মত পোশাক পরে নারীকে বাইরে যেতে হবে। কোনো অবস্খাতেই পর্দাবিহীন সাজগোজ করে নারী বাইরে যেতে পারবে না। পুরুষ কিংবা বিধর্মীদের মতো পোশাক পরা যাবে না।

ইসলাম নারীকে অসাধারণ মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার দিয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইসলামে নারী-পুরুষ সবার সমানাধিকার স্বীকৃত। সৃষ্টিগতভাবে নারীরা কিছু সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে না। তাই তারা বল্গাহীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে না, তেমনিভাবে ঘরের চার দেয়ালেও আটকে থাকবে না। তাদের কিছু নিয়ম-কানুন মেনে সমাজ ও দেশ গঠনে যথাযথভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে।

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 6, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: