RSS

বই কিভাবে জঙ্গি হয়?

06 ডিসে.

বই কিভাবে জঙ্গি হয়?


লিখেছেনঃ ডক্টর মো: রেদওয়ানুর রহমান
পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই কিছু শিরোনাম চোখে পড়ে, যা রীতিমতো বিবেকবান মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। যেমন,হল তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জঙ্গি বই উদ্ধার, ছাত্রী হলের সিঁড়ির নিচ থেকে জেহাদি বই উদ্ধার করেছে পুলিশ,শহরের ছাত্রীনিবাসগুলো তল্লাশি চালিয়ে কাউকে গ্রেফতার করতে না পারলেও জঙ্গি সিডি ও জেহাদি বইয়ের সìধান লাভ… ইত্যাদি। এই সংবাদগুলো বাংলাদেশের বিবেকবান মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। তাহলে কি ধরে নেবো, যারা এই তল্লাশি এবং প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে তারা ধর্মবিশ্বাসী নন। যদি মুসলমান হন, তাদের ঘরে কি কুরআন, হাদিস, ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা বইপুস্তক নেই? যদি থেকেই থাকে তবে তারা কি জঙ্গি হয়ে গেছেন? টুপি, দাড়ি, হিজাব, ইসলামি বই থাকলেই জঙ্গি বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পর্দানশীন নারীসমাজ ও ইসলামি পোশাকধারী জনগোষ্ঠীকে জঙ্গি বলে পাকড়াও করা হচ্ছে। সরকারপ্রধানের কাছে আমার অনুরোধ, কোন কোন বই জঙ্গি বা জেহাদি বই তার একটা তালিকা প্রকাশ করুন এবং জঙ্গি বা জেহাদি বইয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিন। আর ওই তালিকা প্রতিটি ঘরে পাঠিয়ে দিন। তাহলে আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী তালিকাভুক্ত বইগুলো সব নদীতে ফেলে দেবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হল, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাসের শিক্ষার্থীরা আর জেহাদি বই আতঙ্কে ভুগবেন না। সেই সাথে ঘরে রাখা যাবে এমন ইসলামি বইয়ের তালিকা পাঠানো আবশ্যক।

পত্রিকার কোনো লেখা আমার কখনো চোখে পড়েনি যে, অশ্লীল পোশাক পরিধান, পর্নো সিডি, নিষিদ্ধ পত্রিকা বা পর্নোগ্রাফি ছবি, ইয়াবা সেবন, হিরোইন, ফেনসিডিল বা মাদক সেবনের কারণে কোনো ছাত্র, ছাত্রীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পার্শবর্তী আবাসিক এলাকাগুলো এসব নিষিদ্ধ পণ্যে সয়লাব। কোনো পত্রিকার পাতায় দেখিনি এসব উদ্ধারে সরকারের বিশেষ নির্দেশ বা পুলিশি অভিযান। দেশের মানুষ হতবাক হয়েছে, বোরখা পরিধান এবং ইসলামি শিক্ষার কারণে কিছু ছাত্রীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে, এটা কয়েক দিন আগে পত্রিকায় বেশ ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। ইসলামি বই রাখার কারণে সারা দেশে প্রায় এক হাজার ছাত্র আজ জেল হাজতে। কোনো পত্রিকার পাতায় চোখে পড়েনি যে, ইভটিজিং, ছাত্রীর শ্লীলতাহানির কারণে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো সোনার ছেলে আজ জেল হাজতে। পত্রিকায় দেখেছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের সেঞ্চুরির পর মিষ্টি উৎসবের খবর। বাঁধনের নাম আজও উদাহরণ হয়ে হয়ে আছে। তাদের জন্য সাঁড়াশি বা চিরুনি অভিযানের প্রয়োজন হয় না।

কয়েক দিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক রিকশাচালক বলল স্যার, আমার রিকশায় সিটের ওপর বসাতে পারব না। সে মলিন মুখে বেদনাভরা কণ্ঠে জানালো স্যার, আমার সিটের নিচে কুরআন হাদিসের বই। এগুলো এক ছাত্র আমাকে আমার বস্তির ঘরের চালার তলে রাখতে বলেছে। কারণ এগুলো থাকলে নাকি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যাবে। স্যার কেন? আমার নীরবতা এবং নিরুত্তর দেখে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, এরা বলেছিল ভোট দিলে ইসলামের কোনো ক্ষতি করব না, তাই ভোট দিয়েছিলাম … হেরা এখনই …।

আমার এক বìধু কয়েক দিন থেকে বারবার ফোন করে বলছে তোমার জেহাদি বইগুলো সরিয়ে ফেল… বলা যায় না। আজ আবার ফোন করে জানতে চাইল, আমি বইগুলো সরিয়েছি কি না। আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হলাম, তাকে বললাম কোথায় রাখব। আমি এতগুলো বই রিকশাওয়ালাকে দিতে পারি না। কুরআন-হাদিস ইসলামি বই বলে টয়লেটের ফলস ছাদেও রাখতে পারি না। তা ছাড়া বই সরাবো কেন, এই বইগুলো তো বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হাদিস, কুরআন এবং ইসলামি সাহিত্য। এগুলো যদি তোমাদের ভাষায় জেহাদি বই হয়ে থাকে তাহলে আমার করার কিছু নেই।

এ দিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মেধাবী এবং সাধারণ ছাত্রের বাবা আমার কাছে ফোন করে বলেছেন,তাদের ছেলেরা পুলিশের গ্রেফতার অভিযান থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ছাত্রাবাসের রুমের দেয়ালে মেডোনা, স্পাইস গার্লদের নগ্নছবি ঝুলিয়েছে। কুরআন, হাদিস ও ইসলামি বইগুলো কাজের বুয়ার বস্তির ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। নামাজ ছেড়ে দিয়ে নিয়মিত ধূমপান করছে, আধুনিকতার জন্য ছেঁড়া জিন্স প্যান্ট এবং মাইকেল জ্যাকসনের ছবি সম্মিলিত টিশার্ট পরছে। ক্যাম্পাসের গার্ল ফেন্সন্ডদের সাথে নিয়মিত চুটিয়ে আড্ডা মারছে, এর জন্য অবশ্য আমাকে অতিরিক্ত টাকার অঙ্ক গুনতে হচ্ছে। তবুও গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছে। কারণ একটি ক্ষমতাধর ছাত্র সংগঠনের বìধুরা নাকি আগে তাদের নিয়মিত নামাজ পড়তে দেখেছে। আমি একজন শিক্ষক হয়ে ছাত্রদের গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে এরূপ ফোন পেয়ে লজ্জায় আমার মাথা নত হয়ে আসছিল। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, হায় এই মানুষ গড়ার আঙিনায় দাঁড়িয়ে মানুষ গড়ার রূপকার হয়ে আজ একি শুনছি।

সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী পলিটেকনিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হত্যা দেশের সব শ্রেণীর মানুষকে হতাশ করেছে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই নিন্দনীয় অপরাধ। বহু প্রত্যাশা নিয়ে আমরা দেশের মানুষ বাঁধভাঙা ভোটের জোয়ার দিয়ে মহাজোটকে মহাক্ষমতাশীন করেছি। তাই আমরা দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। আমি একজন বিবেকবান শিক্ষক হয়ে বিবেকের তাড়নায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি, সম্প্রতি ক্যাস্পাসের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই এবং প্রমাণ সাপেক্ষে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। সবাই আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। সব দলের বা মতের আদর্শের ছাত্ররা আমাদের সন্তানের মতো। একটি স্বাধীন দেশে বহু মত, বহু পথের আদর্শের অনুসারী থাকতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশে সবার মত বা আদর্শ প্রকাশের অধিকার আছে। কেউ আমাদের প্রতিপক্ষ নয়। তাহলে, চিরুনি অভিযান কার বিরুদ্ধে? আমাদের সবার বাসায় ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা বই আছে। তাহলে আমরা কি সবাই জেহাদি বা জঙ্গি হয়ে যাব? যদি না হই তবে কাউকে প্রতিপক্ষ ভেবে ওই অপবাদ দেয়া কি বিবেক বিরুদ্ধ কাজ নয়? দেশের সব শ্রেণীর মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। জেহাদি বই,জঙ্গি বই, জঙ্গি তত্ত্বের জুজুর অরাজক পরিস্খিতির আমরা অবসান চাই। পর্দানশীন নারীসমাজ ও ইসলামি পোশাক পরিধানকারী জনগোষ্ঠী আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত চান না। আর চান না অপমানিত হতে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আপনাদের কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ, আমি একজন অধম শিক্ষক হয়ে আবেদন করছি, কোনো অপশক্তি যেন কোনো ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত হানতে না পারে। সরকারকে কেউ যেন ভুল পথে পরিচালিত না করে। ধর্মীয় শিক্ষাকে যেন কেহ নিগৃহীত করতে না পারে, পর্দানশীন নারীসমাজকে যেন আর অপমানিত না হতে হয়। ধর্মীয় পুস্তককে যেন জেহাদি বা জঙ্গি বই না বলা হয় এবং বই রাখার অপরাধে ধর্মপ্রাণ মানুষকে গ্রেফতার করা না হয়।

Advertisements
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: