RSS

মুসলিম সমাজে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত

06 ডিসে.

মুসলিম সমাজে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত

জীবনের স্রোতোধারার অনিবার্য সঙ্গী হলো মানবজাতি৷ নরএবংনারীমানবজাতির এই জীবনধারাকে প্রবাহমান গতি দিয়েছে সেই সৃষ্টির আদি মানব আদমের যুগ থেকে৷ বর্তমান বিশ্বের ৬১০ কোটি মানুষ যুগ-যুগান্তের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার এখন৷ মানুষ সম্পর্কে প্রসিদ্ধ একটি বক্তব্য প্রায় সবারই জানা, তাহলো-মানুষ হলো বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণী৷ সত্যিই এই বিচারবোধই মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে তুলেছে৷ সেজন্যে মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মত জীবন যাপন না করে আল্লাহ প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গড়ে তুলেছে একটি সুশৃঙ্খল সামাজিক ও পারিবারিক জীবন৷যুগে যুগে আল্লাহ প্রেরিত রাসূলগণই এই পরিবার গঠনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন৷ সুশৃঙ্খল এই পারিবারিক কাঠামো থেকেই মানুষ পেয়েছে সভ্যতার আলো৷ পরিবার কাঠামোর সাথে সভ্যতা যেন নিত্যসঙ্গী৷ যেখানে পরিবার কাঠামো নেই, সেখানে সভ্যতা বলতে যা বোঝায়, তার সাথে অন্যান্য প্রাণীকূলের জীবনযাপন পদ্ধতির খুব বেশী পার্থক্য নেই৷নারী এবং পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে পরিবার৷ এই সম্মিলিতশব্দের মধ্যেই নিহিত রয়েছে নারী-পুরুষের পারস্পরিক অবদান এবং অধিকারের সূক্ষ্ম বিষয়৷ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই নারী-পুরুষের অধিকার এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্ম ও আদর্শগত মতবাদ বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশ করেছে৷ সেসব দৃষ্টিভঙ্গীঅনুযায়ী একমাত্র ইসলাম ব্যতীত অন্য সকল ধর্ম ও মতবাদই নারীকে কখনো ভোগ্যপণ্যে কিংবা কখনো পুরুষ দেবতার সেবাদাসীতে পরিণত করেছে৷ সভ্যতার এই স্বর্ণযুগেও নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অধিকার নিয়ে এখনো চলছে বিচিত্র কৌণিক মতামত৷

পশ্চিমা সমাজে পরিবার কাঠামো ভেঙ্গে পড়ায় সেখানে বিবাহ-বহির্ভূত লিভিং টুগেদার বা নারী-পুরুষের একত্রবাস প্রথা চালু রয়েছে৷ এছাড়া বিয়ের প্রচলন সেখানে যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, তাতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার প্রশ্নে মতবিরোধের জের ধরে ডিভোর্সের মাত্রাই ব্যাপক৷ যে সমাজে লিভ-টুগেদারের জন্যে বিয়েরই প্রয়োজন নেই, সে সমাজে ডিভোর্স বা তালাক প্রদানের মাত্রা যে কতো মামুলি ও ভয়াবহ, তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানে বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মানদন্ডে পশ্চিমা জগত আধুনিক সভ্যতার দাবীদার হলেও ক্ষয়িষ্ণু পরিবার কাঠামোর ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতা বিশ্বব্যাপী অকল্যাণই বয়ে এনেছে৷ তাদের ঐ কু-সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাবে মুসলিম জাতির মধ্যেও তা এখন সংক্রমিত হচ্ছে৷ এরফলে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা ব্যাপক বেড়ে গেছে৷ অথচ পরিবারের প্রধান যে দুটি স্তম্ভ অর্থাৎ বাবা-মা বা স্বামী-স্ত্রী-তাদের মধ্যে যদি পারস্পরিক কর্তব্যবোধ স্পষ্টভাবে জাগ্রত থাকতো, তাহলে এই সমস্যা হয়তো দেখাই দিত না৷ বহু শিক্ষিত পরিবারেও যথার্থ ইসলামী শিক্ষার অভাবে এ ধরণের সমস্যা বিরাজ করছে৷ শিক্ষিত এইসব পরিবার তাদের পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে চিন্তা করে থাকে পাশ্চাত্যের মানদন্ডে, যেখানে নারী-পুরুষস্বাধীনভাবে যাপন করছে পশুর মত জীবন৷ তাই মুসলিম দম্পতিদের উচিৎ তাদের নিজস্ব ধর্মাদর্শ সম্পর্কে সচেতন হয়ে পারস্পরিক কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত হওয়া এবং যথাযথভাবে তা মেনে চলা৷ তাহলেই দেখা যাবে সংসার হয়ে উঠেছে শান্তির সোনালী নীড়।
একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, স্বামী-স্ত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন এবং পারস্পরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামই সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ স্থাপন করেছে৷ ইসলাম পূর্বকালে নারীকে মানুষই মনে করা হতো না৷ গ্রীকরা তাদেরকে মনে করতো শয়তানের চর৷ জৈবিক চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনেই তাদের ব্যবহার করা হতো৷ রোমানদের অবস্থাও ছিল তাই৷ সেখানে কন্যাসন্তানকে বিক্রি করা হতো৷ জাহেলিয়াতের যুগে আরবে কন্যাসন্তানকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার ইতিহাস সর্বজনবিদিত৷ পারস্য সভ্যতায়ও কন্যাসন্তানকে ভীষণরকম অকল্যাণকর বলে মনে করা হতো৷ চীনের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, কোন পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্ম হলে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনরা দুঃখ ও সহানুভূতি জানাতো৷অর্থাৎ নারী ছিল একটা ভোগ্যপণ্য ৷ তাদের ব্যক্তিগত কোন মানবিক সত্ত্বাই স্বীকার হতো না ৷ আর হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা মৃত ব্যক্তির সাথে তার স্ত্রীকেও জীবন্ত পুড়ে মারতো৷ এরকম করুণ একটা ঘটনাকে তারা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা ও ত্যাগের নিদর্শন বলে মনে করতো৷ কী আশ্চর্য, বিধবাকে সম্পত্তির অধিকার না দিয়ে, দিয়েছিলচিতার আগুনে জীবন্ত পোড়াবার নির্দেশ ! এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র উপায়ে নারীদের সত্ত্বাকে লাঞ্চিত করা হয়েছিল৷ ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের ফলে নারী পেল তার মৌলিক মানবিক অধিকার। নবী করিম (সাঃ) ঘোষণা করেন, হে মুসলমানেরা! তোমাদের উপর তোমাদের স্ত্রীদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের উপরও তোমাদের অধিকার রয়েছে৷” আল্লাহ রাববুল আলামীন বললেন, নারীরা তোমাদের পোষাক এবং পুরুষরাও নারীদের পোষাকস্বরূপ৷ যুগান্তকারী এইসব ঘোষণার মাধ্যমে নারী ফিরে পেল তাদের অধিকার, ফিরে পেল মানুষ হিসাবে তাদের অস্তিত্ব, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারাও হয়ে উঠলো সভ্যতা সৃষ্টির প্রশংসিত স্রষ্টাদের গর্বিত অংশীদার ৷ কবি নজরুলের ভাষায়- পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

ইসলাম নারী এবং পুরুষকে তাদের পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি পরিবারের শৃঙ্খলা বিধানের জন্যে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে একটা আদর্শ সমাজ বিনির্মানকে সুনিশ্চিত করেছে৷ পরিবারের মূল হলো স্বামী-স্ত্রী বা বাবা-মা৷ স্বামী-স্ত্রীর জীবনে শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অনুশীলন যদি না থাকে, তাহলে তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবনেও তা আশা করা যায় না৷ আর স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের বংশধরের সামষ্টিক রূপই হলো সমাজ৷ আর সমাজ কাঠামোর বৃহত্তর সংগঠনই রাষ্ট্র৷ তাই বলা যায় একটা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও আদর্শের মূল ভিত্তিই হলো পরিবার৷ ইসলাম তাই পরিবার তথা বাবা-মা এবং তাদের সন্তানদের মধ্যকার পারস্পরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিধানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একের প্রতি অপরের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন সম্পর্কে যথাযথ রূপরেখা দিয়ে দিয়েছে ৷ কারণ স্বামী-স্ত্রীর সুদৃঢ় বন্ধনই উত্তর প্রজন্মের নৈতিক শৃঙ্খলা বিধানের একমাত্র উপায় ৷ সমাজের প্রতি একটু সচেতন দৃষ্টি দিলে লক্ষ্য করা যাবে, যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ রয়েছে, সে পরিবারে শান্তিতো নেই-ই বরং পরবর্তী প্রজন্মও বিশৃঙখল জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে৷ সামাজিক অনাচার, মাদকাশক্তিসহ মানবিক মূল্যবোধ বর্জিত কর্মকান্ডের মূলে রয়েছে এই পারিবারিক বিশৃঙ্খলা৷ অথচ পরিবারে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা সাধারণত খুবই ছোটখাট ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধে ওঠে৷ ঘটনাগুলোর জন্য পারস্পরিক অহমবোধ, অশ্রদ্ধা, সম্মানহীনতা এবং নিজ নিজ কর্তব্যের ব্যাপারে ইসলামের বেধে দেয়া মানদন্ড সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা না থাকাই দায়ী৷ আমাদের সমাজে এখনও অজ্ঞানতাবশত স্বামীদের অনেকেই মনে করেন যে, স্ত্রী হলেন তাদের দাসীর মতো৷ স্ত্রীর কাজ হলো স্বামীর সকল আদেশ মেনে চলা৷ খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন স্ত্রী এ ধরনের স্বৈরাচারী স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নেয় না৷ সেজন্যেই শুরু হয় দ্বন্দ্বের সূত্রপাত৷ স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের ওপর যেরকম অধিকার চর্চা করার চেষ্টা চালায়, স্ত্রীদেরও যে স্বামীর ওপর সেরকম আধিকার চর্চার সুযোগরয়েছে এ কথাটা স্বামীরা ভুলে যান এবং পুরুষতান্ত্রীক স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেন৷ সেজন্যে স্ত্রীর ওপর স্বামীর কর্তব্য এবং স্বামীর ওপর স্ত্রীর কর্তব্য সংক্রান্ত ইসলামী নীতিমালা নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করব৷ প্রথমেই আমরা স্ত্রীর ওপর স্বামীর কী কী কর্তব্য রয়েছে সেগুলো তুলে ধরবো৷ একজন পুরুষ ইসলামের এইনীতিমালার মানদন্ডে নিজেকে বিচার করবেন এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা ও দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন এটাই প্রত্যাশা৷

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 6, 2010 in ইসলাম

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: