RSS

মৃত্যু অবধারিত

06 ডিসে.

মৃত্যু অবধারিত


সুন্দর এই পৃথিবীতে যত আদর-যত্নেই আমরা লালিত-পালিত হই না কেন; যত সুন্দর সুউচ্চ প্রাসাদেই বসবাস করি না কেন; পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততির মায়া-মমতা, ভালোবাসা, স্নেহ ত্যাগ করে ভয়ঙ্কর যমদূতের ডাকে একদিন আমাদের সাড়া দিতেই হবে। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

কী সুন্দর এ ধরণী! এখানে আছে নদ-নদী, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, সমভূমি, সাগর, মহাসাগর, হন্সদ,গাছপালা, ফলমূল, পশুপাখি, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, আলো-বাতাস, লাখ লাখ তারকাশোভিত গগন প্রভৃতি। পৃথিবীর এই অপরূপ সুন্দর সাজানো বাগান ছেড়ে একদিন আমাদেরকে দুনিয়ার মোহ-মায়া-মমতা ত্যাগ করে চিরবিদায় নিতে হবে! কিন্তু মায়াময় এই পৃথিবী ছেড়ে কেউ সহজেই চলে যেতে চায় না, সবাই চায় বাঁচতে। যে দুনিয়ার সুখকে বা সফলতাকে প্রধান্য দেয়, সে অবশ্যই ভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত। কারণ দুনিয়ার আরাম-আয়েশ-আনন্দ ক্ষণস্খায়ী, আর আখেরাতের পুণ্যের পাল্লা যাদের ভারী থাকে তারাই চিরস্খায়ী।

আমাদের জীবনের শেষ অতিথি যার নাম মালাকুল মাউত। তিনি কেবল একজন ফেরেশতা। তার নাম হজরত আজরাইল আ:। তিনি সে কাজই সম্পাদন করেন যে কাজের জন্য তিনি আদেশানুবর্তী।

মৃত্যু এমন এক শরবতের পেয়ালা যা সবাইকে পান করতে হবে, কবর এমন এক দরজা যা দিয়ে সবাইকে প্রবেশ করতে হবে। ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবাইকেই মরতে হবে। কোনো শক্তি ও সম্পদের বিনিময়ে তাকে পেছানো যায় না। শক্তিহীন ও শক্তিধর সবাইকে এর সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছেতোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছি, পুনরায় মাটিতেই ফিরিয়ে আনব এবং তা থেকেই তোমাদেরকে পুনরুথান করব। (সূরা- তোয়াহা, আয়াত-৫৫)

মৃত্যুর লক্ষ্য হলো সবাইকে আল্লাহতায়ালার কাছে ফিরিয়ে নেয়া এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সূরা- আম্বিয়া, আয়াত-৩৫)

মৃত্যুর বিষয়ে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণহীন আতঙ্ক বোধ করলে চলবে না। কারণ আমাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণে মৃত্যুপ্রক্রিয়া থেমে থাকবে না। নিরাপত্তার জন্য আমরা যেখানেই লুকাই না কেন, হোক সে উঁচু স্খান কিংবা গভীর গহ্বরে ঠিকই মৃত্যু আমাদেরকে খুঁজে বের করবে।

পবিত্র কুরআনের পরিভাষায়, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরও অবস্খান করো, তবুও।’ (সূরা-নিসা, আয়াত-৭৮)।

মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘মৃত্যুর স্বাদ প্রত্যেক জীবকেই আস্বাদন করতে হবে।তা ছাড়া দুনিয়ার ভোগবিলাসের উপকরণ মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। আস্তে আস্তে নিজেকে গোমরাহির দিকে নিয়ে যায়। তখন নানা রকম অপকর্ম-পাপকাজ করতে বিবেকে বাধে না। মৃত্যুর কথা মনে পড়লেই আমরা মৃত্যুর কথা ভুলে থাকতে চাই। কারণ তখন আর মৃত্যু আমাদের কাম্য নয়। মানুষ দুনিয়ার সুখ-শান্তি ও সম্পদের প্রাচুর্যের মোহে মৃত্যু ও কবরের কথা ভুলে যায়। কিন্তু মৃত্যু তাদেরকে সেই স্মৃতির বাস্তব ময়দানে পৌঁছায়। মানুষ অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু এসে পড়ার আগে আগেই জীবনের সব আনন্দ, উপভোগ, প্রাপ্তি, আকাáক্ষা, সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি চরিতার্থ করে নিতে চায়। জীবনের সাধ-আহ্লাদ, হাসিখুশি, আমোদ-প্রমোদ, উৎসব, অনুষ্ঠান ইত্যাদি সাধনায় মানুষ মাঝে মধ্যে এমন অìধ হয়ে যায় যে, মৃত্যুভয়কেও সে পরোয়া করে না। মৃত্যু বলে যে একটা জিনিস আছে, এ বাস্তব সত্যটাকে তখন তারা আর মনে করে না।

দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, বিলাস-বৈভবে মত্ত থাকে। তেমনি এ মাটির পৃথিবীর অস্খায়ী মানুষ ও তার পরকালের আসল ঠিকানা ভুলে যায়। দুনিয়ার জীবন হচ্ছে খেলাধুলা ও সৌন্দর্য অর্থাৎ খেলতামাশার মতো।’ (সূরা-মোহাম্মদ-৩৬)।

পবিত্র হাদিস শরিফে এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত ইবনে ওমর রা: বর্ণনা করেন, আমরা দশ ব্যক্তি রাসূলে পাক সা:-এর দরবারে উপস্খিত ছিলাম। এক আনসারী প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা:, পৃথিবীতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে? এরশাদ হলো, ওই ব্যক্তি সবচেয়ে বুদ্ধিমান, যে সব সময় মৃত্যুকে স্মরণ করে এবং তার জন্য সর্বদা প্রস্তুতি নিতে থাকে। আর তারাই ইহকাল ও পরকালে সম্মানের পাত্র হবে।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহতায়ালাকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করে তা চিন্তা করা, আল্লাহতায়ালাকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা করো, আল্লাহতায়ালা সে সম্পর্কে খবর রাখেন।’ (সূরা-হাশর, আয়াত-১৮)

আল্লাহপাক কুরআন মাজিদে আরো বলেছেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে মৃত্যুকে নির্ধারিত করেছি।’ (সূরা- ওয়াকিয়াহ,আয়াত-৬০)।

প্রত্যেক প্রাণীকে মরতে হবে। অত:পর তোমাদেরকে আমার কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ (সূরা-আনকাবুত, আয়াত-৫৭)

মহান রাব্বুল আলামিন আরো বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের অর্থসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না রাখে। যারা ওই রকম হয় তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ (সূরা-মুনাফিকুন, আয়াত-৯)। অথচ যখন হঠাৎ করে মৃত্যু এসে হাজির হয়, পুঞ্জীভূত সম্পদ থেকে দান করার সুযোগ তখন অবশিষ্ট থাকে না।তোমাদের মৃত্যু আসার আগেই আল্লাহপ্রদত্ত রিজিক থেকে খরচ করো যেন এ আফসোস করা না লাগে হে আল্লাহ! যদি তুমি আমাকে অল্প সময়ের সুযোগ দিয়ে মৃত্যুকে পিছিয়ে দিতে তাহলে আমি সদকা করতাম এবং নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কোনো প্রাণের মৃত্যুর সময় উপস্খিত হলে আল্লাহ কখনো তা পিছিয়ে দেন না।’ (সূরা-মুনাফিকুন,আয়াত-১০ ও ১১)

মৃত্যু এক মিনিটও বিলম্বিত করবে না। নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত সময়ে অবশ্যই মৃত্যু হাজির হয়ে যাবে এবং প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে। প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুর নির্ধারিত সময় যখন উপস্খিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না।’ (সূরা-মুনাফিকুন, আয়াত-১১)।

মহান আল্লাহতায়ালা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন। আল কুরআনের ভাষায় যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন,যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।’ (সূরা-মুলক, আয়াত-২)।

দেহে আত্মার অনুপস্খিতিই হলো মৃত্যু। পবিত্র কুরআনের অনেক সূরায় এর বর্ণনা আছে। মানুষের মৃত্যুকে তার জন্য একটা বিপর্যয় মনে করা হয়। সৎকর্মশীল মুমিন বান্দার মৃত্যুকে কুরআন যে ভাষায় সংজ্ঞায়িত করে বিপরীত কর্মী ও ধর্মীয় ব্যক্তির মৃত্যুকে সেভাবে চিত্রিত করে না। বিভিন্ন হাদিস শরিফে জানা যায়, বিশ্বাসী মুসলিম মুমিন বান্দার মৃত্যুকে সহজীকরণ ও সুসংবাদসহ ঘটানো হয়। অপরপক্ষে অবিশ্বাসী ও পাপাচারীদের মৃত্যুকে ভয়ঙ্কর, কষ্টদায়ক ও কঠিনভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। আল্লাহবিমুখ মানুষের মৃত্যু যেভাবে বাস্তবায়িত হয় পবিত্র কুরআনের ভাষায় তা হলোআপনি দেখেন যখন জালেমরা মৃত্যুযন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের করো স্বীয় আত্মা! আজ তোমাদের অপমানের শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর ওপর অসত্য বলতে, তার আয়াতসমূহ থেকে অহঙ্কারে মুখ ফিরিয়ে নিতে।’ (আল কুরআন) আর তুমি যদি দেখতে পেতে যখন ফেরেশতারা কাফিরদের জান কবজ করে; তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে বলে, আস্বাদন করো দহন যন্ত্রণা।’ (আল কুরআন)।

Advertisements
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: