RSS

রাষ্ট্রব্যবস্খা : মানবতার রক্ষাকবচ

06 Dec

রাষ্ট্রব্যবস্খা : মানবতার রক্ষাকবচ


ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধক বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুনিয়াবাসী ঢাকঢোল পিটিয়ে মুসলিম বিশ্বে একমাত্র কামাল পাশাই সর্বপ্রথম তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল। সারা দেশে আজান নিষিদ্ধ, আরবি অক্ষর উৎখাত, টুপি ও বোরকা ব্যবহার নিষিদ্ধ, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, প্রকাশ্যে মদপান ও জেনা-ব্যভিচার বৈধসহ সব রকম ইসলামবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বৃদ্ধিই ছিল তার আমরণ সাধনার বিষফল। এ কাজে সে এতটুকুন সফলতা লাভের পেছনে একমাত্র নিয়ামক শক্তি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা। ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরপরই এসব বিধিবিধানের কার্যকরী প্রভাব জনসাধারণের ওপর প্রতীয়মান হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুবাদে তার হিংস্র থাবার বিপরীতে আমজনতার ভূমিকা অসহায় হরিণশাবককেও হার মানিয়েছিল। শুধু একবার প্রত্যুষে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোরঅপরাধেএক মুয়াজ্জিনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারতে সে কুণ্ঠাবোধ করেনি।

কামাল পাশার আরোপিত সামগ্রিক বিধিনিষেধ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ দাঁড়িয়েছিল ইসলাম বর্জন। ইসলামকে ঘায়েল করতে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে একমাত্র ও যোগ্য হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছিল সে। তাই কামাল পাশা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের কাছে আজীবন ঋণী থেকে গেল বোঝা যায়।

আজকে আমাদের দেশে যেসব জাতি বা গোষ্ঠী ধর্মকে উপেক্ষা করার কথা বলছে, ইসলামের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছে,ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টায় উঠেপড়ে লেগেছে সেসব কামাল পাশার উত্তরসূরিরা, ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের ধ্বজাধারীরাও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ২৪ কোটি মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে চিরতরে উঠিয়ে দিতে তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও লড়ে যাবে। এ নীতিতে তারা বদ্ধপরিকর। এর জ্বলন্ত প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে সুস্পষ্ট ভাষায় লিখিত আছে। আবু জেহেল, আবু লাহাব, ওতবা,শায়বা প্রমুখ তাগুতের পা-চাটা গোলামরা আজ জীবিত নেই; এ কথা সত্য। তার চেয়ে শতভাগ সত্য, যুক্তিনির্ভর ও বাস্তব কথা হচ্ছে তাদের উত্তরসূরিরা আজো সেসব আল্লাহর শত্রুদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজকে পরিপূর্ণ রূপদান করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাবে। কিন্তু তারা ব্যর্থ, পদদলিত, লাঞ্ছিত, অপমানিত, অপাঙ্ক্তেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ কথাই বলেছেনতারা চায় মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর আলোকে নিভিয়ে দিতে। অথচ আল্লাহ তাঁর আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে’ (সূরা আছ-ছফ : ৮)।

এ ছাড়াও ইউরোপে ক্যাপিটালিজম, রাশিয়ায় লেনিনের সেক্যুলারিজমসহ নানা মানবরচিত মতাদর্শ এ যাবৎ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঠিকই; তাদের সফলতা শূন্যের কোঠায়। তারা মানবতার সেবার নামে মানবতাকে ঠকিয়েছে, নারী স্বাধীনতার পরিবর্তে নারীকে করেছে কলঙ্কিত, লাঞ্ছিত। ভোগ্যপণ্য হিসেবে নারীকে উপস্খাপন করেছে জাতির সামনে। পাশ্চাত্য সভ্যতার তথাকথিত সভ্য মানবগোষ্ঠীর অসভ্যতার মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। বছর পাঁচেক আগের এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সেখানে প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি অপরাধ, প্রতি ঘন্টায় একটি খুন, প্রতি ২৫ মিনিটে একটি ধর্ষণ, প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি ডাকাতি এবং প্রতি মিনিটে একটি গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে এর পরিমাণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে তা নিরেট বাস্তবতা।

তাদের এত সব অপকর্মের বোঝা বহন করতে করতে তারা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। কখনো তারা পারেনি ইসলামকে চুল পরিমাণ পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে।

প্রকৃতপক্ষে ইসলাম আদৌ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেনি, ভাবার সুযোগও নেই। ইসলাম মহান, উদার সার্বজনীন। ইসলামের তুলনা ইসলাম ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। বিশ্ব দরবারে মানবতার মুক্তির প্রথম স্লোগান তুলেছে এই ইসলাম। ধনীর কাছ থেকে মজলুম গরিবের অধিকার আদায়ের দৃষ্টান্ত একমাত্র ইসলামই পেশ করতে সক্ষম হয়েছে। মানুষে মানুষে সাম্যতার নজির ইসলাম ছাড়া কেউ দেখাতে পারেনি। অর্ধপৃথিবীর শাসক হজরত উমর রা:-এর শাসনামলে একটি ঘটনা ঘটেছিল, যাতে দেখা যায় ইসলামের আইনে সব মানুষ অবিমিশ্রভাবে সমান। সৈয়দ আমীর আলী ঘটনাটি তার দ্য স্পিরিট অব ইসলাম’ (The sprit of Islam) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন :

সামানিদের রাজা জাবালা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মদিনার উদ্দেশে রওনা হন খলিফা উমরকে শ্রদ্ধা-সম্মান জানানোর জন্য। নগরীতে প্রবেশ করেন বিশাল আড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। যথোচিত মর্যাদার সাথে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। কাবা প্রদক্ষিণ করার সময় একজন দীন হজযাত্রী যিনি একই পবিত্র কর্তব্য সম্পাদন করছিলেন। দৈবক্রমে তার হজপালনের এক খণ্ড বস্ত্র রাজা জাবালার স্কìেধ এসে পড়ে। জাবালা ক্রোধোন্মত্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়ান এবং তাকে মুষ্টাঘাত করেন, ফলে দরিদ্র মানুষটির দাঁত পড়ে যায়। এই কাহিনীর বাকিটুকু সিরিয়াতে মুসলমান সেনাদের অধিনায়কত্বে নিয়োজিত আবু ওবাইদাকে লিখিত পত্রে উমর ফারুক রা:-এর নিজের ভাষায় এরূপ : দরিদ্র মানুষটি আমার কাছে এসে এই দুষ্কার্যের প্রতিবিধান কামনা করে। আমি জাবালাকে ডেকে পাঠাই। তিনি আমার সামনে এলে একজন মুসলমান ভ্রাতার সাথে তার এহেন দুর্ব্যবহারের কারণ জানতে চাই। তিনি উত্তর করেন, মানুষটি তাকে অপমান করেছে, ঘটনাস্খলের পবিত্রতার কথা স্মরণ করে তিনি তাকে ছেড়ে দেন, নইলে তিনি তাকে অকুস্খলে হত্যা করে বসতেন। আমি উত্তরে বলি, তার এই উক্তি তার অপরাধকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি আহত লোকটির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন, তাকে আইনের আওতায় স্বাভাবিক দণ্ডের জন্য অনুবর্তী হতে হবে। জাবালা উত্তর করেন : আমি একজন রাজা এবং সে একজন সাধারণ ব্যক্তি মাত্র। রাজা কিংবা প্রজা নয়, আপনারা উভয়েই মুসলমান এবং আইনের চোখে আপানারা উভয়েই সমান।তিনি বলেন, দণ্ডদান আগামী দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করা যেতে পারে এবং আহত ব্যক্তিটির সম্মতিক্রমে, আমি বিলম্ব মেনে নিলাম। রাতেই জাবালা পলায়ন করে এবং সে তখন বায়েজান্টাইন খ্রিষ্টানদের সাথে যোগ দেয়। কিন্তু আল্লাহপাক আপনাকে (দরিদ্র লোকটিকে) বিজয়ী করলেন, তাকে নয় এবং তার মতো সবাইকে নয়।

এটা ইসলামের বিচার, সাম্যের বিচার, মানবতার বিচার। এ বিচার নিরপেক্ষতাবাদীদের কপালে কুঠারাঘাত হেনেছে। তারা এ বিচার নীতিকে মানতে নারাজ। মানবতার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে তারা সদাপ্রস্তুত। মুখে বড় বড় বুলি আওড়ানো তাদের সুন্দরতম ট্র্যাডিশন। তারা জাতির শত্রু, ইসলামের শত্রু, মানবতার শত্রু। জাতি তাদের কালো চেহারাগুলো চিনে নিতে মোটেও ভুল করবে না। কিছু সময় ধৈর্য ধরার গুরুদায়িত্ব আমাদের।

ইসলাম কোনো ব্যক্তিবিশেষের মস্তিষ্কপ্রসূত বা কোনো দার্শনিক, ধর্মগুরুর সৃষ্ট নির্দিষ্ট কোনো জাতিগোষ্ঠীর ধর্ম নয়। এটা সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্খা, এই রাষ্ট্রের শাসকরা মানবতার অতন্দ্র প্রহরী। এসব শাসকের অন্তরে শোষণ করার লিïসা ছিল না। তাদের অনুভূতি এমন ছিল যদি ফুরাত নদীর তীরেও একটি কুকুর না খেয়ে মরে তবে আমি উমরকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

কালের আবর্তনে আজ আমরা আমাদের অবস্খানকে এমন জায়গায় নিয়ে এসেছি যেখানে চতুষ্পদপ্রাণী দূরে থাক দুই পা-বিশিষ্ট মানুষ নামক প্রাণীরও অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম। আমাদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরার হিম্মত কারোর নেই। আজ না খেয়ে অসুখ-বিসুখে শত শত লোক অকালে মরলেও দেখার কেউ নেই। কারণ, আজ তো আর সেই উমর নেই।

মুসলমানরা কখনো তাগুতের রক্তচক্ষুকে ভয় করেনি, বরং তা উপড়ে ফেলেছে। ৩১৩ জন মুজাহিদ সহস্র শত্রুবেষ্টিত দলকে এমনভাবে পরাজিত করেছিল যে, মুসলমানদের সাহস ও শক্তির প্রশংসা চক্ষুশরমে অন্যের কাছে না বললেও নিজেরা ঠিক ঠিক বুঝতে পেরেছিল। যেহেতু তারা ভুক্তভোগী বলে কথা। বর্তমানে যারা হাত নাড়িয়ে, চোখ রাঙিয়ে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টায় খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে; তারা তো আর ভুক্তভোগীদের কাতারে এখনো শামিল হয়নি। এই সুবাদে তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি এখনো অনেকাংশ খালি করতে আগুনের দিকে এগোচ্ছে। আসলে পিপীলিকার এই জ্ঞানটুকু নেই যে, তার পাখার বেসামাল ঝাপটানি তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারবে।

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 6, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: