RSS

শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উপায়

06 ডিসে.

শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উপায়


সৃষ্টির সেরা এই মানুষের মধ্যে বোধশক্তি ও কর্মশক্তির তাৎপর্য অনুধাবন ও তার প্রয়োগের কারণে যে বিভিন্ন জাতির উদ্ভব, তার মধ্যে মুসলিম জাতিকে আল্লাহতায়ালা সর্বোত্তম জাতি হিসেবে ঘোষণা দিতে এরশাদ করেন কুন্তুম খাইরা উম্মাতিন উখরিজাত লিন্নাস। তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির জন্য তোমাদের উদ্ভব। এ শ্রেষ্ঠত্ব কিসে?হজরত কালবি রা: বলেন, ‘এ আয়াতে অন্যান্য জাতির তুলনায় উম্মতে মুহাম্মদী শুধু নির্দিষ্ট বিষয়ই নয়, বরং সব দিক থেকে এ উম্মত শ্রেষ্ঠ।

এ শ্রেষ্ঠত্বের কারণ আল্লাহই বলে দিয়েছেন, তা হলো এ উম্মত মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য মনোনীত হয়েছে। মুসলমান জাতি গোটা বিশ্বের মানবজাতির কল্যাণ সাধন করবে আর এটাই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ। মুসলিম জাতির অস্তিত্ব সৃষ্টি ও অন্যান্য জাতির ওপর তার প্রভাব বিস্তারের সিদ্ধান্ত স্বয়ং আল্লাহই নিয়েছেন।

মুসলিম জাতি কী কল্যাণ সাধন করে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব অর্জন করবে? তা হলো অন্যান্য জাতিকে আঁধার থেকে আলোর জগতে নিয়ে আসবে। শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব পেতে তাই আল্লাহর নির্দেশ, ‘তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্খাপন করবে। এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইমাম গাজ্জালি রহ: যে কথা বলেছেন তা-ই প্রকৃত সত্য। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, এ আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উল্লিখিত গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের জন্যই এ উম্মত শ্রেষ্ঠতম উম্মত হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তাই এ উম্মত সৎ কাজের নির্দেশ ও গর্হিত কাজে বারণ পরিত্যাগ করলে শ্রেষ্ঠত্ব বিনষ্ট হয়ে যাবে। তাই উম্মতে মুহাম্মদী সা: গোটা মানবজাতির কল্যাণ কামনার ফলেই সর্বোৎকৃষ্ট উম্মত। কেননা তারা মানুষকে আদেশ দেবে, মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, যাতে গোটা মানবগোষ্ঠী শান্তিময় জীবনযাপন করতে পারে। তাই এ উম্মতের দ্বারা অন্যের কল্যাণ সাধিত হওয়াই মূল উদ্দেশ্য। (মুকা শাফাতুল কুলুব)

বিশ্বের মুসলিম জাতির দিকে তাকালে শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষ থেকে অধ:পতনের অপমান বড়ই পীড়া প্রদান করে। আজ গোটা বিশ্বে মুসলিম জাতি নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নেতৃত্বশূন্য। খেলাফতে রাশেদার পর থেকে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও পরবর্তী যুগ মুসলিম জাতির যে অধ:পতনের ক্রমপ্রবহমান ধারা অবিরত চলছে তা থেকে রক্ষার উপায় নিয়েই আজকালের বিদগ্ধ মুসলিমসমাজ চিন্তায় নিমগ্ন। আল্লামা ইকবাল বলেন, সমাজের অধ:পতন রোধের একমাত্র কার্যকর পথ হচ্ছে সেই সমাজে আত্মশক্তি প্রবুদ্ধ মানুষ গড়ে তোলা। শুধু তারাই পারেন জীবনের গভীরতার দিকনির্দেশনা দিতে। তাদের জীবনে যে নতুন আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভ করবে তারই আলোকে আমাদের বোধগম্য হবে যে, আমাদের উপস্খিত পারিপার্শ্বিকতা এমন অখণ্ডনীয় কিছু নয় এবং অবস্খাভেদে তার সংশোধন আবশ্যক।

আমাদের উপস্খিত পারিপার্শ্বিকতার দাবি বহুমুখী ও ব্যাপক। এ পরিস্খিতিতে শুধু খ্রিষ্টান মিশনারির কায়দায় ইসলামের তবলিগ করে বেড়ানো একেবারেই অর্থহীন। আকিদা বিশ্বাসের পরিশুদ্ধির জন্য একটি নয়, বরং লাখ লাখ পুস্তিকা প্রকাশ করলেও এ অবস্খার পরিবর্তন হবে না। ইসলামের মধ্যে যা কিছু শক্তি ও সৌন্দর্য রয়েছে তা কার্যকর করা হয়েছে। এ দুনিয়া হচ্ছে সঙ্ঘাত ও সংগ্রামের দুনিয়া। নিছক বুলির সাহায্যে এর গতি বদলানো যেতে পারে না। একে বদলাতে হলে এক বিপ্লবাত্মক জিহাদের প্রয়োজন। মুসলমানদের পক্ষে দুনিয়ায় আবার প্রতিষ্ঠা লাভ না করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠা শুধু ওয়াজ-নসিহত আর সদুপদেশ দ্বারা লাভ করা যাবে না। এর জন্য বাস্তব প্রয়াস-প্রচেষ্টা প্রয়োজন এবং আল্লাহর মনোনীত পন্থায় কাজ করা দরকার।

আল্লাহর মনোনীত পন্থায় কাজ করে রাসূল সা: যে বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন, বিপ্লব সৃষ্টির যে আদর্শ রেখে গেছেন তাই প্রকৃত আদর্শ। হজরত মুহাম্মদ সা: দুনিয়ায় আগমন করেন, তখন জীবনের এই নদী কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছিল?তামাম দুনিয়ায় কি তখন কুফর ও শিরকের প্রাধান্য বর্তমান ছিল না? জালিম ও স্বৈরাচারী শাসনশক্তি কি তখন কায়েম ছিল না? শ্রেণীভেদের বৈষম্য কি মানবতাকে কালিমালিপ্ত করে রাখেনি? নৈতিকতা, অশ্লীলতা, সমাজজীবন ও অর্থনীতিতে জুলুমমূলক সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদ এবং আইনকানুনের কি অবিচারের প্রাধান্য ছিল না। কিন্তু একটি মাত্র লোক দাঁড়িয়েই গোটা দুনিয়াকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসলেন। তৎকালীন দুনিয়ার সব ভ্রান্ত চিন্তা, মতবাদ ও গলদ পন্থাকে তিনি রহিত করে দিলেন এবং সেগুলোর মোকাবেলায় একটি ওহিভিত্তিক নিজস্ব মত প্রচার ও জিহাদের দ্বারা দুনিয়ার গতিকে তিনি ঘুরিয়ে দিলেন এবং এভাবে জামানার রঙও বদলে ফেললেন।

জমানার রঙ বদলানো বর্তমানেও সম্ভব। ফরাসি বিপ্লব, কমিউনিস্ট বিপ্লব প্রভৃতি ঘটনা প্রমাণ করে যে রাসূলের আদর্শে প্রচেষ্টা চালালে এখনো সমাজজীবনে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। তুর্কি বিপ্লব তো মাত্র সে দিনের ঘটনা। তাই ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী উপযুক্ত জাতি সৃষ্টি করা সম্ভব হলে গোটা বিশ্বের জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা অসম্ভব তো নয়ই, বরং বিশ্বময় কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ন্যায়ের শাসন ও অন্যায়ের প্রতিরোধ কার্যকর করেই আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে, এটাই আল্লাহর অভিপ্রায়। বিশ্ব মানবতার কল্যাণ সাধন এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ন্যায়ের শাসন, আদল ও ইহসান প্রতিষ্ঠা এক বিরাট দায়িত্ব এবং বিশ্বের ওপর যে অন্যায়, জুলুম ও পাপের ভারী বোঝা চেপে আছে তার উৎখাত মুসলিম জাতির জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ আজ মরক্কো থেকে শুরু করে দূরপ্রাচ্য অবধি গোটা মুসলিম জাহান পাশ্চাত্য জাতিগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শাসনতান্ত্রিক প্রাধান্যের অক্টোপাসে বন্দী হয়ে আছে। পাশাপাশি পাশ্চাত্যের দর্শন ও তার উদ্ভাবিত কৃষ্টি সভ্যতার জাল ছিন্ন করা মুসলিম জাতির জন্য বিরাট শ্রমসাধ্য কাজ। আজ তাই মানুষের কল্যাণ সাধন ও মারুফের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও মুনকারের দাপট মুছে দিতে শুধু ওয়াজ-নসিহত ও কিছুসংখ্যক মামুলি অধ্যাত্ম দর্শনের কিতাব রচনার মাধ্যমেই সম্ভব নয়।

আজ তাই গোটা বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য মুসলমানদের আবার বিশ্বসভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওস্তাদ হতে হবে। নৈতিক, আধ্যাত্মিক প্রযুক্তি, দর্শন, কলা সব বিষয়ে পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উজ্জ্বলতাকে মöান করে কুরআনের আলোকে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখাকে নতুন করে আলোকিত করতে হবে। এ কাজটি কত কঠিন তা বুদ্ধিজীবী সমাজ সহজেই ধারণা করতে পারেন।

বিশ্বমানবতার কল্যাণ সাধনের মধ্য দিয়ে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে বর্তমান অবস্খায় প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একান্ত প্রয়োজন। তার নিজ অন্তরের গভীরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা; কিছুকালের জন্য একমাত্র নিজেরই ওপর নিজ দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত করা। তাহলেই সম্ভব হবে যথোপযুক্ত শক্তি ও সামর্থ্য সঞ্চয় করে যথাসময়ে মুসলিম সাধারণ তন্ত্রগুলোর সমবায়ে একটি জীবন্ত ইসলামি পরিবার গড়ে তোলার কাজ। আর একমাত্র তখনই সম্ভব মুসলমান জাতির পক্ষে দিশেহারা জাতিকে সঠিক পথ দেখিয়ে বিশ্বমানবতার কল্যাণ সাধন।

Advertisements
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: