RSS

অজুর সময়ও পানির অপচয় করা যাবে না

07 Dec

অজুর সময়ও পানির অপচয় করা যাবে না


প্রত্যেক মুসলিমের দৈনন্দিন ধর্মীয় আচারের অপরিহার্য অঙ্গ হলো অজু। কুরআন ও হাদিসে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে (Qur’an 8:43 & 5:6)(Bukhari Vol.1, Book 4, Nos.142,161,165,186 etc)। প্রতিদিন নামাজের আগে অজুর মাধ্যমে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিষ্কার করে আমরা বিশুদ্ধতা অর্জন করি। কিন্তু লক্ষণীয়, অজু করার সময় পানির অপচয় না করা এবং সার্বিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কথাও যে কুরআন ও হাদিসে রয়েছে সেটা অনেক সময় আমরা বিবেচনা করি না।

আরব আমিরাতের দুবাই শহরের বেশ কিছু মসজিদে চালানো সাম্প্রতিক এক জরিপে অজুর সময় পানি অপচয়ের নমুনা দেখে বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত হয়েছেন। দেখা গেছে, পানির ট্যাপ বা কল ছেড়ে দিয়ে কোনো মুসল্লি জুতা-মোজা খুলছেন, অনেকে পাশের কারো সাথে আড্ডা জুড়ে দিয়েছেন; এ দিকে কলের মুখ দিয়ে পূর্ণবেগে ড্রেনের মধ্যে বয়ে চলেছে পানির অমূল্য স্রোতধারা। কোনো মুসল্লি আবার দীর্ঘক্ষণ ধরে অজুতে মগ্ন, হাত-পা বারবার ধুয়েই চলেছেন,পেছনে কেউ অপেক্ষা করছেন কি না সে দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। মসজিদের গুপ্ত ক্যামেরায় এসব ধরা পড়েছে। এ ধরনের আচরণ ইসলামিক শিক্ষা ও চেতনার পরিপন্থী। ধর্মীয় অনুশাসন পালন করার জন্য ব্যবহৃত হয় বলে অজুর পানিকে সচরাচর অপচয় বলে গণ্য করা হয় না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যদিও অজু করা হয়, মাত্রাতিরিক্ত পানি খরচ করলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার যে নির্দেশ কুরআনে রয়েছে তা মেনে চলা হয় না ‘…eat and drink; But waste not by excess, for Allah loveth not the wasters’ (7:31, óYousuf Ali)। শেষ বিচারের দিন ধনী-গরিব সবাইকে নিজের সম্পদের হিসাব দিতে হবে। অজুর সময় পানি অপচয় করলে তার জবাবদিহিও আমাদের করতে হবে। অজু করার সময় আমরা যে হারে পানি অপচয় করি, তাতে যে জন্য অজু করা অর্থাৎ সেই নামাজ আল্লাহর কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।

ছোটবেলা থেকে যে হাদিসটির কথা শুনে আসছি তা হলো ‘Cleanliness is half of Iman (Faith)…’ (Muslim, Book 2, No. 0432)। মুসলিম অধুøষিত বিভিন্ন দেশের শৌচাগারের যে হাল দেখেছি তাতে মনে হয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ধারণা ইসলামের মূল বিশ্বাসে প্রোথিত থাকলেও বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে আমরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। বৃক্ষের পরিচয় যেমন ফলে; তেমনি আমাদের কর্ম, আচার-ব্যবহার দেখে অমুসলিম সমাজ ইসলাম সম্পর্কে যাতে ভুল ধারণা না পায় সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।

এবার দেখা যাক অজুর জন্য আমাদের রাসূল সাঃ কতটুকু পানি ব্যবহার করতেন- ‘The Prophet used to perform ablution with one Mudd of water.’ (Bukhari, Vol. 1. Book 4, No. 200 & Muslim). মুনাজাতের ভঙ্গিতে জড়ো করা দুই হাতের তালুর কোষে যতটুকু পানি ধরবে সেটাই হলো এক মাদ, যা ৫৪৩ গ্রামের সমতুল্য। একবার ভেবে দেখুন,মহানবী কত অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে অজু সম্পন্ন করতেন! যুক্তির খাতিরে বলা যায়, মরুভূমিতে পানির অভাব বলেই হয়তো রাসূল সাঃ সামান্য পানিতেই অজু সারতেন। কিন্তু নিচের হাদিসটি দেখুন ‘Do not be wasteful when performing wudhu even if you were at a flowing river…’ (Ahmed, Ibn Majah).

পৃথিবীর ৯৭.৫ ভাগ পানি লবণাক্ত বা পানের অযোগ্য। বাকি ২.৫ ভাগের দুই-তৃতীয়াংশ হলো বরফ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর পানির মাত্র ০.০৮ ভাগ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী! জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বে পানির চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি পানিও ব্যাপক হারে হ্র্রাস পাচ্ছে। ঢাকাসহ অন্য শহরগুলোতে এখন পানি সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে সারা বিশ্বে ১১০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারে না। প্রতি বছর ৫০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে দূষিত পানির কারণে। মৃতুø হচ্ছে প্রতিদিন ছয় হাজার নিষ্পাপ শিশুর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ ৪০০ কোটি মানুষ পানির অভাবে ভুগবে। তবে পানি অপচয়ের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো সবচেয়ে এগিয়ে। অন্য দিকে মধ্যপ্রাচ্যে পানি দুষ্প্রাপ্য হলেও কাতার, আরব আমিরাতের মতো দেশে জনপ্রতি দৈনিক পানির চাহিদা ৫০০-৫৫০ লিটার! এটা উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের চেয়েও বেশি। তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে পানির উৎস হলো সমুদ্র। সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পরিশোধন করে সুপেয় করা হয়, যাতে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রচুর বিদুøৎ ও জ্বালানি। কার্বন দূষণের শিকার হচ্ছে পরিবেশ, সবুজ গ্যাস নির্গমনের ফলে ওজোন স্তর ক্ষীণ হয়ে আসছে, যা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।

আমরা একটু সচেতন ও দায়িত্বশীল হলে বিশ্বের পানি সংরক্ষণে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারি। সুখের কথা হলো,প্রত্যেক মুসলিমের এই সুযোগ রয়েছে দিনে অন্তত পাঁচবার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে অজু করার সময়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা যা করতে পারি পানির কল পুরো না খুলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অজু শেষ করা; অজুর প্রস্তুতি পর্বে ট্যাপ খোলা না রাখা; পানির ট্যাপে Water saving device  যুক্ত করা, যা দিয়ে পানির অপচয় খরচ ৭০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব; পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবকে অজু করার সময় রয়েসয়ে পানি খরচ করার জন্য সচেতন করা; স্কুল-কলেজে ভিডিও প্রদর্শনের মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রভৃতি।

মসজিদ কর্তৃপক্ষ যেসব উদ্যোগ নিতে পারেঃ খুতবার সময় ইমামদের পানির অপচয় রোধ করার জন্য কুরান ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মুসল্লিদের তাগাদা দেয়া; ০ জুমার সময় হ্যান্ডবিল বিতরণ করা; ০ আজানের পর সংক্ষিপ্ত ঘোষণা দেয়া, যা রেকর্ড করেও বাজানো যেতে পারে; ০ অজুর ব্যবহৃত পানি পরিশোধন করে পুনঃব্যবহার করা; ০ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে অজুর জন্য ব্যবহার করা; ০ পানির ট্যাপে Water saving device যুক্ত করা প্রভৃতি।

দুবাইয়ের একজন ভারতীয় প্রকৌশলী গবেষণা করে দেখেছেন, অজু করার সময় মুসল্লিরা সর্বোচ্চ দু-তিন লিটার পর্যন্ত পানি খরচ করে থাকেন। বিশ্বের বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা হলো প্রায় ১৫০ কোটি। অজুর জন্য দিনে প্রত্যেক মুসলিম যদি গড়ে এক লিটার করেও পানি খরচ করেন, তাহলে সেটার যোগফল গিয়ে দাঁড়ায় চার হাজার সুইমিং পুল ভর্তি পানির সমান! তাই একটু দায়িত্বশীল হয়ে অজুর পানি খরচ করলে পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি আমরা আল্লাহ ও রাসূলেরও সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হবো। মহানবী সাঃ বলেন ‘There will be people from my nation who will transgress in making supplications and in purifying themselves.’ (Ahmad, Abu Dawud and An-Nasa’i).

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 7, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: