RSS

ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্ক

07 Dec

ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্ক

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, এটি কোনো আচারসর্বস্ব ধর্ম নয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম দিয়েছে সঠিক দিকনির্দেশনা। সামাজিক সম্পর্ক ও সামাজিক রীতিনীতির ক্ষেত্রেও ইসলাম খুবই সুন্দর ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। ইসলাম সমাজের ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ককে দুটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। একটি হচ্ছে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক। এ সম্পর্ক বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচ্ছিন্ন বন্ধনের কাজ করে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে অধিকার ও মান-মর্যাদা সংরক্ষণ। এর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তির রক্ত, মানসম্মান ও ধনসম্পদের নিরাপত্তা সংরক্ষিত হয়। যেসব কথা, ব্যবহার, আচরণ বা কাজ এ ভিত্তিদ্বয়কে ক্ষুণ্ন বা ক্ষতিগ্রস্ত করে তা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এ ক্ষতি বৈষয়িক দৃষ্টিতে হোক অথবা সামাজিক বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতে হোক, তাতে কোনো পার্থক্য হয় না। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো অতিগুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসে বিশেষভাবে নির্দেশনা রয়েছে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, পারস্পরিক সন্ধি-সমঝোতাকরণ, বিদ্রূপ, দুর্নাম, খারাপ ধারণা, চোগলখোরি ও গিবত থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি। এরকম বেশকিছু বিষয় রয়েছে, যা সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে। কোরআন, হাদিস ও আমাদের সামাজিকতার আলোকে সে ধরনের কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায়।
আত্মীয়তার সম্পর্ক পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক। তার মধ্যে রেহেম বা রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তার গুরুত্ব আরও বেশি। নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক বোঝাতে আরবিতে ‘রেহম’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইসলামী পরিভাষায় আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কের সংরক্ষণকে ‘সেলায়ে-রেহমি’ (রেহম রক্ষা করা) বলা হয়। আর এ সম্পর্ক নষ্ট করলে তাকে বলা হয় ‘কেতয়ে-রেহমি’ (রেহম ছিন্ন করা)। রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়দের সঙ্গে আত্মীয়তা রক্ষা করা তথা সেলায়ে রেহমিকে ইসলাম ওয়াজিব ঘোষণা করেছে। এ সম্পর্ক যত গভীর সে অনুপাতে তা রক্ষা করার তাগিদও ততই বেশি ও বলিষ্ঠ। সম্পর্ক ছিন্ন করা তথা কেতয়ে-রেহমি কঠিনভাবে হারাম।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : এবং ভয় কর আল্লাহকে, যাঁর দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছে নিজের হক বা অধিকারের দাবি কর। আর নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ককেও ভয় কর (রক্ষা কর)। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের পর্যবেক্ষণে রত (আন নিসা-১)।
অন্য এক হাদিসে নিকটাত্মীয়তার গুরুত্ব এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে তার মূল্য বোঝাতে রূপকভাবে বলা হয়েছে, ‘রেহম’- রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়তা আকাশের সঙ্গে ঝুলে থেকে বলে : যে আমাকে রক্ষা করল আল্লাহও তাকে রক্ষা করবেন আর যে আমাকে ছিন্ন করল আল্লাহও তাকে ছিন্ন করবেন (বুখারি-মুসলিম)।

আরেক হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেন : ‘রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়তা ছিন্নকারী কখনও বেহেশতে যাবে না।।’ ‘সেলায়ে-রেহমি’র জন্য পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু সমতা বিধানই যথেষ্ট নয়। এ সম্পর্কে এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘সেলায়ে-রেহমি’ রক্ষাকারী হচ্ছে সে, যে তা ছিন্নকারীর সঙ্গে রক্ষা করে (বোখারি)। অর্থাত্ একজন সদাচরণ করলে অপরজন যদি সদাচরণ করে তবে দ্বিতীয় ব্যক্তির এ সদাচরণ ‘সেলায়ে-রেহমি’ রক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে না। বরং একজন সম্পর্ক রাখতে না চাইলেও অপর আত্মীয় যদি যেঁচে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়, তবেই সে প্রকৃত অর্থে ‘সেলায়ে- রেহমি’ রক্ষা করল। কারণ সে শুধু ভালোআচরণের জবাবে ভালো আচরণ করেনি বরং সদাচরণ না পেয়েও কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী মানবিকতার দাবিতে সদাচরণ করতে উদ্যোগী হয়েছে।

শুধু পরকালেই নয়, ‘সেলায়ে-রেহমি’র পুরস্কার ইহকালেও রয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেন—যেব্যক্তি তার রিজিকের প্রাচুর্য এবং দীর্ঘ জীবনের প্রত্যাশা করে, তার উচিত আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা (মেশকাত)। ‘সেলায়ে-রেহমি’র আরেকটি অবশ্যকরণীয় বিষয় হলো, অভাবগ্রস্ত নিকটাত্মীয়কে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, ‘কোনো অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করলে সদকার সওয়াব পাওয়া যাবে। কিন্তু কোনো নিকটাত্মীয়কে সাহায্য করলে একই সঙ্গে সদকা এবং আত্মীয়তার হক আদায়ের দ্বৈত সওয়াব লাভ করা যায়’ (মেশকাত)।

সেজন্যই আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতি সবার মনোযোগী হতে হবে। পরপর অবস্থান ও সামর্থ্যের মধ্যে এ বিষয়ে উদ্যেঅগী হতে হবে। সাধারণ রেষারেষি, প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কিংবা জেদের বশবর্তী হয়ে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না, মলিন হতে দেয়া যাবে না। দেখা-সাক্ষাত্, যোগাযোগ, খোঁজখবর বজায় রাখার মধ্যদিয়ে এ সম্পর্ক উজ্জ্বল করে তুলতে হবে। আত্মীয়ের অসহায়ত্ব এবং নিজের সামর্থ্যের সমন্বয় করে প্রয়োজনে সাহায্য নিয়ে আত্মীয়ের পাশে দাঁড়াতে হবে।

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 7, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: