RSS

কুরআন মজিদ ও মহাবিশ্ব

07 Dec

কুরআন মজিদ ও মহাবিশ্ব


আল্লাহতায়ালা কুরআন মজিদে বারবার তাঁর নিদর্শনগুলোর দিকে নজর দিতে বলেছেন। তিনি বলেন, প্রকৃতিতে তাঁর নানা নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যারা প্রকৃত জ্ঞানী বা প্রজ্ঞাময়, তারা এসব নিদর্শন থেকে জ্ঞান হাসিল করতে সক্ষম; আর সেই সাথে এ মহাবিস্ময়ে মহাবিশ্বের স্রষ্টার প্রতি মাথা নত হয়ে আসে।

কুরআন বলে, ‘তিনি (আল্লাহ) যথাবিধি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যখন তিনি বলেন, ‘হও’, তা হয়ে যায়। তাঁর কথাই সত্য।’ (সূরা আনয়ামঃ ৭৩ আয়াত)।

এ আল্লাহর সৃষ্টি! তিনি ছাড়া অন্যরা কী সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও? না, সীমালঙ্ঘনকারীরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।’ ( সূরা লোকমানঃ ১০-১১ আয়াত)।

তিনি সুপরিকল্পিতভাবে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাত্রি দিয়ে দিনকে ও দিনকে দিয়ে রাত্রিকে ঢেকে রাখেন ও সূর্যকে নিয়মের করেছেন অধীন। প্রত্যেকেই আবর্তন করে এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত। জেনে রাখো, তিনি পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।’ (সূরা যুমারঃ ৫ আয়াত)।

তাঁর (আল্লাহর) অন্যতম নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি, আর এই দুইয়ের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন যেসব জীবন্ত সেগুলো। যখন ইচ্ছা তিনি তখনই তাদের সমবেত করতে সক্ষম।’ (সূরা শূরাঃ ২৯ আয়াত)।

আমি (আল্লাহ) আমার ক্ষমতায় আকাশ তৈরি করেছি, আর আমি নিশ্চয়ই মহাপরাক্রান্ত, আমি মাটিকে বিছিয়ে দিয়েছি; এ আমি কত সুন্দরভাবেই না বিছিয়েছি! আমি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’ (সূরা জারিয়াতঃ ৪৭-৪৯ আয়াত)।

তিনি (আল্লাহ) স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাত আকাশ সৃষ্টি করেছেন; করুণাময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি না? তারপর তুমি বারবার তাকাও তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে।’ (সূরা মুলকঃ ৩-৪ আয়াত)।

তোমাদের সৃষ্টি বেশি কঠিন, না আকাশের? তিনি (আল্লাহ) এ নির্মাণ করেছেন; একে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনিই রাত্রিকে অন্ধকারে ছেয়ে রেখেছেন ও দিনে প্রকাশ করেছেন সূর্যের আলো। তারপর তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন, তার থেকে ঝরনা ও চারণভূমি বের করেছেন ও পর্বতকে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন। (এ সমস্ত) তোমাদের জন্য ও তোমাদের আনয়ামের (পশুর) ভোগের জন্য।’ (সূরা নাজিয়াতঃ ২৭-৩৩ আয়াত)।

অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল। তারপর আমি (আল্লাহ) উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং সব কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবু কি ওরা বিশ্বাস করবে না? আর আমি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত সৃষ্টি করেছি, যাতে পৃথিবী ওদের নিয়ে এদিকে বা ওদিকে চলে না যায়, আর আমি ওর মধ্যে প্রশস্ত পথ করে দিয়েছি, যাতে ওরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে। আর আমি আকাশকে করেছি এক সুরক্ষিত ছাদ, তবুও ওরা তাঁর নিদর্শনগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে; প্রত্যেকেই নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।’ (সূরা আম্বিয়াঃ ৩০-৩৩ আয়াত)।

এখন আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকাই। কী বিশাল এই মহাবিশ্ব। কিভাবে এটি শুরু হলো। কিভাবে এটি চালিত হচ্ছে আমরা কি ভেবে দেখেছি? মহাবিশ্বের বিশালত্ব ও এর জটিলতা এত বিস্ময়কর যে, ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনমন্তব্য করেছে, মানুষ এ বিষয়ে এখন যা জানছে তাতে হতবাক হয়ে পড়ছে। (National Geographic, The increiredible Universe, by kenneth F. Weaver, May 1974, P. 589)।

পুরনো টেলিস্কোপ (দুরবিন) দিয়ে যে মহাকাশ মহাবিশ্ব প্রত্যক্ষ করা হয়েছিল, তাতে পূর্ণ চিত্র উদঘাটিত হয়নি। কিছু কিছু অংশ মেঘের মতো গ্যাসের মতো মনে হয়েছিল। এখন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আবিষ্কারে এসব মেঘ বা গ্যাসের মতো পদার্থকে দেখা যাচ্ছে বিরাট বিরাট গ্যালাক্সি (ছায়াপথ) রূপে, অর্থাৎ এসব হলো গ্যাসসহ কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের সমষ্টি। একটি কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াসের চার দিকে ঘুরছে নিজস্ব কক্ষপথে। কুরআন বলে, ‘আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী স্থির করেছেন, যাতে ওরা কক্ষচুøত না হয়, ওরা কক্ষচুøত হলে কে ওদের স্থির রাখবে?’ (সূরা ফাতিরঃ ৪১ আয়াত)।

তারপর তিনি (আল্লাহ) আকাশের দিকে মন দিলেন, আর এ ছিল ধোঁয়ার মতো। তারপর তিনি একে (আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা কি দুজন স্বেচ্ছায় অস্তিত্বে আসবে, না অনিচ্ছায়? তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় এলাম (অর্থাৎ আমরা অনুগতদের মতোই অস্তিত্ব গ্রহণ করলাম)। তারপর তিনি দুই দিনের মধ্যে সাত আকাশ বানালেন এবং প্রত্যেক আকাশে তাঁর বিধান ওহি করলেন। আর আমি পৃথিবীর আকাশকে উজ্জ্বল প্রদীপ দিয়ে সজ্জিত করলাম এবং ভালোভাবে সুরক্ষিত করে দিলাম। এসবই এক মহাপরাক্রমশালী জ্ঞানী সত্তার পরিকল্পনা।’ (সূরা হামিম সিজদাঃ ১১-১২ আয়াত)।

মাওলানা সৈয়দ আবুল আলা মওদূদী তার তাফহিমুল কুরআন তফসির গ্রন্থে লিখেন, ‘বিশ্বজাহানকে আকৃতি দানের আগে তা ছিল আকৃতিহীন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গোধূলির মতো, মহাশূন্যে বস্তুর প্রাথমিক অবস্থায় ছড়ানো ছিল। ধোঁয়া বলতে বস্তুর এই প্রাথমিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিকরা এ জিনিসকেই নীহারিকা বলে ব্যাখ্যা করেন। বিশ্বজাহান সৃষ্টির প্রারম্ভিক পর্যায় সম্পর্কে তাদের ধ্যানধারণাও হচ্ছে, যে বস্তু থেকে বিশ্বজাহান সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টির আগে তা এই ধোঁয়া অথবা নীহারিকার আকারে ছড়ানো ছিল। (১৪ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪)।

মাওলানা মওদূদী আরো লিখেন, ‘এবার আল্লাহর সৃষ্টি পদ্ধতির দিকে লক্ষ করুন। বিশ্বজাহান সৃষ্টির উপকরণ ধোঁয়ার আকারে ছড়িয়ে ছিল। বিশ্বজাহানের বর্তমান যে রূপ আল্লাহ তাকে সেই রূপ দিতে চাইলেন। এ উদ্দেশ্যে তাকে বসে বসে কোনো মানুষ কারিগরের মতো পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য এবং অন্যান্য তারকা ও গ্রহ-উপগ্রহ বানাতে হয়নি; বরং তাঁর পরিকল্পনায় বিশ্বজাহানের যে নকশা ছিল সে অনুসারে তাকে অস্তিত্ব গ্রহণ করতে নির্দেশ দিলেন। অর্থাৎ তিনি যে ছায়াপথ, তারকারাজি এবং গ্রহ-উপগ্রহ সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন, এসব উপকরণ যেন সেই আকৃতি ধারণ করে সেই নির্দেশ দান করলেন। আল্লাহর আদেশের পথে প্রতিবন্ধক হওয়ার ক্ষমতা এসব উপকরণের ছিল না। এ উপকরণগুলোকে বিশ্বজাহানের আকৃতি দান করতে আল্লাহকে কোনো পরিশ্রম করতে ও প্রচেষ্টা চালাতে হয়নি। এক দিকে আদেশ হয়েছে, আরেক দিকে এসব উপকরণ সঙ্কুচিত ও একত্রিত হয়ে অনুগতদের মতো প্রভুর পরিকল্পিত নকশা অনুযায়ী তৈরি হতে শুরু করেছে এবং ৪৮ ঘণ্টায় পৃথিবীসহ সমস্ত বিশ্বজাহান সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেছে।’ (পৃষ্ঠা ১৬)।

কুরআন বলে, ‘আর তিনি (আল্লাহ) পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীলও। তিনিই স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাতটি আসমান তৈরি করেছেন। তুমি রহমানের (স্রষ্টার) সৃষ্টিকর্মে কোনো প্রকার অসঙ্গতি দেখতে পাবে না। আবার চোখ ফিরিয়ে দেখো,কোনো ত্রুটি দেখতে পাচ্ছো কি? তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখো, তোমার দৃষ্টি ক্লান্ত ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে। আমি তোমাদের কাছের আসমানকে সুবিশাল প্রদীপমালায় সজ্জিত করেছি।’ (সূরা মূলকঃ ২-৫ আয়াত)।

আসমান সৃষ্টিতে কোনো ত্রুটিসম্পর্কে মাওলানা সৈয়দ আবুল আলা মওদূদী লিখেন, ‘মূল ব্যবহৃত শব্দটি হলো ফুতুরএর অর্থ ফাটল, ছিদ্র, চিড়, ছেঁড়া, ভাঙাচোরা। অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বজাহানের বাঁধন এত মজবুত এবং পৃথিবীর একটু অণু থেকে বিশালকায় নীহারিকামণ্ডলী পর্যন্ত প্রতিটি বস্তু এমন সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ যে, বিশ্বজাহানের কোথাও শৃঙ্খলার ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয়নি। তোমরা যতই অনুসন্ধান চালাও না কেন, এর কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যাবে না।’ (তাফহিমুল কুরআন, ১৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬)। এই যে বিশাল মহাবিশ্ব তাতে কত শত গ্যালাক্সি রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের পৃথিবী ও সূর্য যে গ্যালাক্সিতে তার নাম করেছেন বৈজ্ঞানিকরা মিল্কিওয়ে’ (দুধের রাস্তা)। আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রায় এক শবিলিয়ন (দশ হাজার কোটি তারকা রয়েছে)! কোনো কোনো বৈজ্ঞানিক মনে করেন, বিশ হাজার থেকে চল্লিশ হাজার কোটি তারকা আছে!

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 7, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: