RSS

সদকায়ে জারিয়ার ফজিলত

07 Dec

সদকায়ে জারিয়ার ফজিলত


ইসলাম মানবকল্যাণ, ত্যাগ ও পরোপকারের ধর্ম। এ ধর্ম কখনো অন্যের চিন্তা বাদ দিয়ে শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা সমর্থন করে না। ইসলাম চায় একে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে একটি সমৃদ্ধ ভ্রাতৃসমাজ। এ জন্য এখানে রয়েছে ধনী-গরিবের জন্য নানা দায়িত্ব ও কর্তব্য। বলা হয়েছে, ‘মানুষের জন্য তুমি তা-ই পছন্দ করো যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ করে থাকো।কুরআনুল কারিমের চতুর্থ পারার শুরুতেই বলা হয়েছেঃকস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না করো। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে আল্লাহ তা জানেন।

উপরিউক্ত তাফসিরে দেখা যায়, আসমানি বাণী শোনার পর প্রিয় বস্তু ব্যয় করার জন্য রাসূল (সাঃ)-এর সাহাবিরা ছিলেন উন্মুখ, উদ্বেল। তাঁরা রীতিমতো ব্যস্ত হয়ে পড়তেন নিজের প্রিয়তম বস্তুটি খুঁজে বের করার জন্য। এরপর তা আল্লাহর রাহে ব্যয় করার মানসে হজরত সাঃ-এর খিদমতে হাজির হতেন। মদিনা শরিফের আনসারদের মধ্যে সর্বপেক্ষা ধনী ছিলেন সাহাবি আবু তালহা রাঃ। নবীজীর মসজিদসংলগ্ন বিপরীত দিকে তাঁর বাগানে একটি মূল্যবান কূপ ছিল। অন্য দশজনের মতো মহানবী সাঃও মাঝে মধ্যে এ কূপের ধারে যেতেন এবং পানি পান করে মরু হাওয়ায় বিদগ্ধ ও তৃষ্ণার্ত প্রাণ শীতল করতেন। আজ দেড় হাজার বছরের ব্যবধানেও তা স্বনামে বিদ্যমান আছে। হজরত আবু তালহা রাঃ-এর এ বাগান ও কূপ অত্যন্ত উর্বর ও মূল্যবান। এ ছিল তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রিয় সম্পত্তি। তিনি তা হুজুর সাঃ-এর পবিত্র দরবারে এসে জনসাধারণের জন্য উৎসর্গের ঘোষণা দেন। (বুখারি, মুসলিম)। এতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ সন্তোষ প্রকাশ করেন, শুকরিয়া করেন এবং তাঁর জন্য প্রাণখুলে দোয়া করেন।

ইসলাম ধর্মে গোপন দান, গোপনই ইবাদত-বন্দেগি। অধিক পছন্দনীয় এবং আল্লাহতায়ালার কাছে মাকবুল যদি তা ব্যাপক মানবকল্যাণ ও মানবসেবার জন্য হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে দানের জন্য বলা হয়েছে এ জন্য যে, যার দেখাদেখি অন্যরা উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ হয়। এ প্রসঙ্গে বুখারি ও মুসলিম শরিফে মহানবী সাঃ-এর উদ্ধৃতি দিয়ে একটি সুন্দর হাদিসও বর্ণিত হয়েছে; দুব্যক্তির কাজেই শুধু ঈর্ষা করা যায়। একজন ওই ব্যক্তি যাকে আল্লাহতায়ালা সম্পদ দান করেছেন। তাই তাকে তা সৎ পথে ব্যয় করার সামর্থø দিয়েছেন। অপরজন হলেন তিনি,যাকে আল্লাহতায়ালা জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছেন এবং তিনি সে অনুযায়ী বিষয়াদির মীমাংসা করেন। আর এ জ্ঞান অন্যকে শিক্ষা দেন।

অর্থাৎ পরোপকারী ধনী ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে হাদিসে ঈর্ষার পাত্ররূপে বর্ণনা করে তাদের আদর্শের অনুসরণে প্রত্যেককে ন্যায়বান, ধনী ও বিজ্ঞ হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া জ্ঞানার্জন ও ধনোপার্জনের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি নয়, বরং জনগণ ও সমাজের কল্যাণ সাধন করা। আজ বিশ্বের চতুর্দিকে তাকালে যে নয়নাভিরাম কল্যাণধর্মী স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান আমরা দেখি, তা তো কোনো না কোনো মানবদরদি মহানুভব ব্যক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাঃ অসংখ্য মসজিদ, হাসপাতাল, সড়ক, সেতু ও বিদ্যালয় নির্মাণ করেন এবং সেচ সুবিধা, পানীয়জলের জন্য খাল খনন করেন। উমর রাঃ ও পরবর্তী ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসকদের মতো আজো যদি আমাদের মধ্যে নিঃস্বার্থ জনসেবার অনুভূতি জাগ্রত হয় তাহলে গরিব, দুঃখী, অভাবী মানুষের দুঃখকষ্ট অনেকাংশে লাঘব হতে পারে। এক সময় মদিনায় পানি স্বল্পতার কারণে মুসলমানদের বেশ কষ্ট হয়। সেখানে রুমা নামে একটি কূপ ছিল যা এক ইহুদির মালিকানায়। সে ব্যক্তি খুব চড়া দামে পানি বিক্রি করত। খলিফা ওসমান রাঃ কূপটি পঁয়ত্রিশ হাজার দিরহামে কিনে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন।

স্মর্তব্য, মানবকল্যাণে পুরুষদের পাশাপাশি মুসলিম নারীদেরও অবদান রয়েছে। ইতিহাস থেকে আমরা জেনেছি, খলিফা হারুনুর রশীদের সহধর্মিণী সম্রাজ্ঞী মহীয়সী জুবায়দা হজব্রত পালনে মক্কায় আগত মুসলমানদের কষ্ট দূর করতে একটি খাল খনন করে পবিত্র মক্কা নগরী, মিনা ও আরাফাতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। এই খাল আজো নহরে জুবায়দানামে প্রসিদ্ধ। আমাদের এই বাংলায় হাজী মুহাম্মদ মুহসীন, নবাব ফয়জুননেসা ও বেগম রোকেয়ার ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জনহিতকর কাজ ও অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

আমরা দেখি, সাধারণত পরোপকার দুভাবে করা যায়। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। জনকল্যাণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু করতে পারাই বড় কথা। যেমন কেউ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করল আর কেউ শুধু একজন রোগীকে সেবাদান করল। হাসপাতাল গড়াই শ্রেষ্ঠ, একজন রোগীর চিকিৎসার সাথে তার তুলনাই হয় না।

শরিয়তের পরিভাষায় এ ধরনের সাধারণ দানকে সদকায়ে জারিয়া বলা হয়। হজরত রাসূল আকরাম সাঃ এরশাদ করেছেনঃ দুটি জিনিস মানুষের উন্নতির উপকরণ। একটি হচ্ছে উত্তম সন্তান’, অপরটি সদকায়ে জারিয়া

হজরত আরো বলেনঃ যখন কোনো মানুষ মারা যায় তখন তার কাছে পুণ্য পৌঁছার সব মাধ্যম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুধু তিনটি পথ তার জন্য খোলা থাকে। ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. সত্যিকার জ্ঞানার্জনের কোনো প্রদীপ প্রজ্বলিত করে যাওয়া, ৩. অথবা কোনো নেক সন্তান তৈরি করে যাওয়া।

চলুন আমরা সৎ চিন্তা, পরোপকার ও সদকায়ে জারিয়ার আলোতে সমাজকে আলোকিত করে তুলি।

Advertisements
 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 7, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: