RSS

আল কুরআনে পর্দার বিধান

07 Dec

আল কুরআনে পর্দার বিধান


পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সব মুসলিম নরনারীর জন্য পর্দা মেনে চলা অত্যাবশ্যক (ফরজ) করে দিয়েছেন। পর্দাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও বিধিবিধান কুরআনের সূরা আহজাব, নূর এবং সূরা আরাফে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনে পর্দা সম্পর্কিত প্রথম নির্দেশনা উম্মুল মুমিনীন হজরত জয়নব বিনতে জাহাশ রাঃ-এর সাথে রাসূূূলুল্লাহ সাঃ-এর বিবাহের সময় অবতীর্ণ হয়। হজরত আনাস রাঃ বলেন, পর্দাসংক্রান্ত প্রথম আয়াত নাজিল হয় পঞ্চম হিজরির জিলকদ মাসে, যখন রাসূূূলুল্লাহ সাঃ-এর সাথে জয়নব বিনতে জাহাশ রাঃ-এর শুভবিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। (রাহুল মায়ানী) কারো মতে এ সময়টি ছিল তৃতীয় হিজরি। আবার কারো মতে পঞ্চম হিজরি। আল্লামা ইবনে কাসির তার তাফসির গ্রন্থে পঞ্চম হিজরিকে অগ্রগণ্যতা দিয়েছেন। সময়কাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও এ বিষয়ে সবাই একমত, পর্দাসংক্রান্ত প্রথম আয়াত এই বিয়ের সময়েই অবতীর্ণ হয়। আর তা হলো পবিত্র কুরআনের সূরা আহজাবের ৫৩ নম্বর আয়াত। এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য আহার্য রন্ধনের অপেক্ষা না করে নবীগৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমাদের ডাকা হলে প্রবেশ করো। অতঃপর খাওয়া শেষে আপনা আপনি চলে যেয়ো, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সঙ্কোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সঙ্কোচ করেন না। তোমরা তার পত্নীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ।এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সহি বুখারিতে হজরত আনাস রাঃ থেকে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, পর্দার আয়াতের স্বরূপ সম্পর্কে আমি সর্বাধিক জ্ঞাত। কারণ, আমি ছিলাম এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। হজরত জয়নব বিনতে জাহাশ রাঃ বিবাহের পর বধূবেশে রাসূূলুল্লাহ সাঃ-এর সাথে তার ঘরে উপস্থিত হন। আল্লাহর রাসূূূল ওলিমার জন্য কিছু খাদ্য প্রস্তুত করেন ও সাহাবিদের দাওয়াত করেন। খাওয়ার পর কিছু লোক পারস্পরিক কথাবার্তার জন্য সেখানে অনড় বসে রইল। তিরমিজির বর্ণনায় এসেছে, রাসূূলুল্লাহ সাঃ সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং হজরত জয়নবও ছিলেন। তিনি সঙ্কোচবশত দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসেছিলেন। লোকজন এভাবে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে রাসূূলুল্লাহ সাঃ কষ্ট অনুভব করছিলেন। তিনি গৃহ থেকে বের হয়ে অন্য স্ত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ ও সালামের জন্য চলে গেলেন। তিনি ফিরে এসে দেখলেন, লোকজন এখনো বসে রয়েছে। রাসূূলুল্লাহ সাঃ-কে আসতে দেখে তাদের সম্বিৎ ফিরে এলো ও তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। এরপর রাসূূলুল্লাহ সাঃ গৃহে প্রবেশ করলেন ও অল্পক্ষণ পরেই আবার বেরিয়ে এলেন। হজরত আনাস রাঃ বলেন, আমি সেখানেই উপস্থিত ছিলাম। তিনি বেরিয়ে এসেই এ আয়াতখানা তেলাওয়াত করে শোনান, যা তখনই অবতীর্ণ হয়। হজরত আনাস রাঃ আরো বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরই মুসলিমরা পর্দা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।

কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিম নারীদের পর্দা মেনে চলার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেন এই সূরারই ৫৯ নম্বর আয়াতে। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণ ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।এই আয়াতে প্রচ্ছন্নভাবে দুটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, নারীদের তাদের বস্ত্রের ওপর জিলবাবপরিধান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জিলবাব হলো বিশেষ ধরনের লম্বা চাদর। ইবনে মাসউদ রাঃ বলেন, এই চাদর ওড়নার ওপর পরিধান করা হয় যা মাথার ওপর দিক থেকে পেঁচিয়ে বক্ষের ওপর রাখা হয়। (ইবনে কাসির) দ্বিতীয়ত, নারীরা যদি নিজেদের জিলবাব দ্বারা ঢেকে নেয় তবে তারা দুশ্চরিত্র লোকদের থেকে নিরাপদে থাকবে এবং তারা সম্মানিত হিসেবে বিবেচিত হবে।

কুরআনে চূড়ান্তভাবে যে আয়াতে আল্লাহতায়ালা নারীদের জন্য পর্দা মেনে চলা ফরজ করে দিয়েছেন তা হলো, সূরা আহজাবের ৩৩ নম্বর আয়াত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে; বর্বর যুগের অনুরূপ। নিজেদের প্রদর্শন করবে না। নামাজ কায়েম করবে, জাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূূূলের আনুগত্য করবে।মুফাসসিররা বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা নারীদের ঘরে অবস্থান করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তবে প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে বের হওয়া নিষিদ্ধ নয়, বরং সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং অহেতুক ঘোরাফেরার উদ্দেশে বের হওয়া নিষিদ্ধ। বিশেষ প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের বোরকা বা অন্য কোনো প্রকারের পর্দা করে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি আছে। (মাআরেফুল কুরআন)।

সূরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা পুরুষদের পর্দা মেনে চলার ক্ষেত্রে করণীয় নির্দেশ করে এরশাদ করছেন, ‘হে নবী! আপনি মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।এর পরের আয়াতেই মহান আল্লাহতায়ালা নারীদের পর্দা মেনে চলার ক্ষেত্রে তাদের করণীয় সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ বলছেন, ‘হে নবী! আপনি মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন সাধারণত যা প্রকাশ থাকে তা ছাড়া তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে। তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীরা, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপনীয়তা প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর সমীপে প্রত্যাবর্তন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।পুরুষ এবং নারীদের পর্দা মেনে চলতে এমন সরাসরি নির্দেশ দেয়ার পর মহান আল্লাহতায়ালা সূরার ২৭-২৮ নম্বর আয়াতে পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে পর্দা পালনের পথকে সুগম করার জন্য বিশেষ কিছু রীতিনীতির প্রতি মানব জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যে নিয়মনীতিগুলো পর্দা মেনে চলার পথকে অধিকতর সুগম করে দেয়। এরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদের সালাম না করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখো।’ ‘যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও তবে অনুমতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ করবে না। যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্য অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা করো আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন।সূরার ৫৯-৬১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের দাসদাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের নামাজের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র খুলে রাখো এবং এশার নামাজের পর। এই তিন সময় তোমাদের দেহ খোলার সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্য কোনো দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়।

তোমাদের সন্তানসন্ততিরা যখন বয়োপ্রাপ্ত হয়, তারাও যেন তাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় অনুমতি চায়। এমনিভাবে আল্লাহ তাঁর আয়াতগুলো তোমাদের কাছে বর্ণনা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।

বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা করে না, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের বস্ত্র খুলে রাখে। তাদের জন্য দোষ নেই, তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।

অন্ধের জন্য দোষ নেই, খঞ্জের জন্য দোষ নেই এবং তোমাদের নিজেদের জন্যও দোষ নেই যে, তোমরা আহার করবে তোমাদের গৃহে অথবা তোমাদের পিতাদের গৃহে অথবা তোমাদের মাতাদের গৃহে অথবা তোমাদের ভাইদের গৃহে অথবা তোমাদের বোনদের গৃহে অথবা তোমাদের পিতৃব্যদের গৃহে অথবা তোমাদের ফুফুদের গৃহে অথবা তোমাদের মামাদের গৃহে অথবা তোমাদের খালাদের গৃহে অথবা সেই গৃহে; যার চাবি আছে তোমাদের হাতে অথবা তোমাদের বন্ধুদের গৃহে। তোমরা একত্রে আহার করো অথবা পৃথকভাবে আহার করো, তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই। অতঃপর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করো, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণকর ও পবিত্র দোয়া। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতগুলো বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝে নাও।

পরিশেষে, সূরা আরাফের ২৬-২৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা গোটা মানব জাতিকে পর্দা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং পর্দা সম্পর্কে মানুষ জাতে বিভ্রান্ত না হয়ে পড়ে সে জন্য হজরত আদম ও হাওয়া আঃ-এর ঐতিহাসিক ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘হে বনি আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং অবতীর্ণ করেছি সাজ-সজ্জার বস্ত্র এবং তাকওয়ার পোশাক, এটি সর্বোত্তম। এটি আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন, যাতে তারা চিন্তাভাবনা করে।

‘হে বনি আদম! শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায়, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছে যাতে তাদের লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদের দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখো না। আমি শয়তানদের তাদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না।’

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 7, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: