RSS

তাকওয়া সফলতার চাবিকাঠি

07 Dec

তাকওয়া সফলতার চাবিকাঠি


তাকওয়া ইসলামের মৌলিক বিষয় এবং মুমিন বান্দার সব ধরনের ইবাদত ও রিয়াজতের মূল উদ্দেশ্য। আরবি মূল শব্দ বেকায়াহথেকে তাকওয়া শব্দটি এসেছে। বেকায়াহশব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ভয় করা, সতর্ক থাকা, বিরত থাকা, সংযমশীল হওয়া, অনিষ্টকর ও কষ্টদায়ক বস্তু থেকে আত্মরক্ষা করা। সাধারণভাবে তাকওয়া বলতে আমরা পরহেজগারি ও আল্লাহভীতিকে বুঝে থাকি। তাত্ত্বিক অর্থে তাকওয়া হলো মানব মনের এক প্রকার অনুভূতি (Inner Motivation), যা খোদাভীতির প্রবল অনুভূতি হতে সৃষ্টি হয় এবং জীবনের প্রতিটি কাজে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পায়।

হজরত ওমর রাঃ তাকওয়ার অর্থ জানতে চাইলে সাহাবা হজরত উবাইদ ইবনে কাব রাঃ বলেন, কাঁটাবনের ভেতর দিয়ে চলতে গেলে যেমন একজনকে সাবধান ও সতর্ক হয়ে চলতে হয়, তেমনি গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করে চলাকে বলে তাকওয়া।এখানে কাঁটাবন হচ্ছে ঘাত-সঙ্ঘাতময় জীবনে চলার পথে যাবতীয় গোপন ও প্রকাশ্য পাপাচার। আর তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করে এসব পরিহার করে পথ চলা অর্থাৎ আমাদের চিন্তা-চেতনায় ব্যক্তিগত,পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন স্তর, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষ্টি, শিল্প-সাহিত্য, বিভিন্ন পেশায় এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো।

তাকওয়া সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যে রকম ভয় করা উচিত তাঁকে তোমরা ঠিক সেভাবে ভয় করতে থাকো এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃতুøবরণ কোরো না।’ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১০২)। এ ক্ষেত্রে মুসলমান অর্থ হলো আল্লাহর আনুগত্য করা, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা। অর্থাৎ তিনি আল কুরআনে যেভাবে চলতে বলেছেন, সেভাবে চলা এবং যা যা নিষেধ করেছেন তা না করা।

হজরত উমর রাঃ-এর শাসনামলে এক বয়স্ক মা দুধের সাথে পানি মেশানোর সময় তার অল্প বয়স্ক মেয়ে তাকে পানি না মেশাতে সতর্ক করে দেয় এই বলে, ‘মা, তোমার মনে কি আল্লাহর ভয় নেই? তুমি কি জানো না যে, আল্লাহ গোপন ও প্রকাশ্য সব দেখেন?’ ‘চোখের অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত।’ (সূরা মুমিন, আয়াত-১৯)।

মূলত তাকওয়া হচ্ছে এমন এক অন্তর্মুখী শক্তিসম্পন্ন গুণ, যা সুপ্ত আত্মা ও বিবেককে জাগ্রত ও উজ্জীবিত করে।

তাকওয়ার অভাবেই ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনে চলছে অভাবনীয় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, জুয়া, হেরোইন,মদ্যপান, ব্যভিচার, খাদ্যে ভেজাল, আমানতের খেয়ানত, গরিব-দুঃখীর সম্পদ হরণ, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ এমনতর বহু পাপাচার ও অপকর্ম। মানুষ কেউ কেউ এক দিকে নামাজ, রোজা করছে, অন্য দিকে অন্যায়, দুর্নীতি এবং পাপকর্মও করে চলছে। আল্লাহপাক যে গোপনীয় ও প্রকাশ্য সব দেখছেন, শুনছেন, দুই কাঁধের দুই ফেরেশতা যে ভালো-মন্দ সব কাজের রেকর্ড করছেন, পরকালে হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে যে এসব অপকর্ম ও দুর্নীতির জবাব দিতে হবে এবং আমাদের হাত, পা, চোখ, কান যে এসব অপকর্মের সাক্ষ্য দেবে তা যেন বেমালুম ভুলে রয়েছে। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ এবং বিবেকসম্পন্ন জীব। তাই মানুষের মনে যদি আল্লাহভীতি কাজ করে, সে কখনো নাফরমানি করতে পারে না। অন্যায়, জুলুম, মিথ্যা, পরচর্চা, রিয়া, অসৎ ও ক্ষতির চিন্তা ও কথাবার্তা তার মনে স্থান করে নিতে পারে না। তার স্বভাব চরিত্র হবে ভালো, সুশৃঙ্খল হবে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং আত্মা হবে স্বচ্ছ আয়নার মতো পরিষ্কার।

একবার রাসূলুল্লাহ সাঃ-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন্‌ কাজের দরুন অধিক লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে? তিনি বললেন, ‘আল্লাহর ভয় এবং উত্তম চরিত্র।’ (তিরমিজি শরিফ)। রাসূল পাক সাঃ-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কে সর্বোত্তম ব্যক্তি? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে সর্বাপেক্ষা অধিক ভয় করে এবং তার আত্মীয়স্বজনের সাথে বেশি সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (তিরমিজি, আহমদ)।

শয়তান স্বভাবগতভাবেই সারাক্ষণ মানুষকে অসৎ ও অনিষ্টকর কার্যাদির প্রতি প্রলুব্ধ করে। অন্তরে তাকওয়ার স্থান দেয়া ব্যতীত নফ্‌স বা মানব মনের এ অবস্থা থেকে উত্তরণের আর কোনো উপায় নেই।

ইসলাম মানুষকে যাবতীয় মন্দ, অশ্লীল, পাপাচার ও অকল্যাণকর কার্যাদি পরিত্যাগ করে যাবতীয় শুভ ও কল্যাণকর কাজ করার শিক্ষা দেয়। আর এটা কোনো মানুষের পক্ষে কেবল তখনই সম্ভব, যখন তার অন্তরে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি স্থান পায়। তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তি পার্থিব জীবনে অনুকূল বা প্রতিকূল উভয় অবস্থাতেই ইসলামের ওপর অটুট থাকতে পারে। তাই মানব চরিত্র গঠনে তাকওয়ার ভূমিকা সর্বাধিক। খোদাভীতি যে মানুষের মধ্যে কাজ করবে সে মানুষ কখনো খারাপ হতে পারে না। তার দ্বারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধবিরোধী কাজ সংঘটিত হয় না। সে হয়ে ওঠে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী। এমন আত্মশুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের দ্বারাই গড়ে ওঠে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সমাজ এবং আদর্শ রাষ্ট্র। তাই ব্যক্তিজীবন, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শৃঙ্খলা ও শান্তি আনয়নের মুখ্য হাতিয়ার হচ্ছে তাকওয়া। এককথায় ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে জাতীয় জীবন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকওয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাকওয়া অবলম্বনের মাধ্যমেই একজন মানুষ ইহকালীন ও পরকালীন সাফল্যের মুকুট মাথায় পরতে সক্ষম হয়। আল্লাহভীতির ফলে মুমিন বান্দার অন্তরে একটি নূরানি অবস্থার সৃষ্টি হয়, যে অবস্থাটি সর্বত্র তার জন্য সত্য ও কল্যাণের প্রদীপস্বরূপ হয়ে থাকে এবং যা কল্‌বের ভেতর তাওহিদ ও আল্লাহর একত্ববাদের গভীর বিশ্বাস জন্মায়।

আর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয়ে ভীত হলো এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করা হতে বিরত রাখল, নিশ্চয়ই বেহেশত হবে তার আবাসস্থল।’ (সূরা নাজিয়াত, আয়াত ৪০-৪১)। তাই বলা যায়,তাকওয়া বা আল্লাহভীতি হচ্ছে সার্থক জীবনের চাবিকাঠি। সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনের সোপান।


 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 7, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: