RSS

মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যবহার প্রসঙ্গে

07 Dec

মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যবহার প্রসঙ্গে


বান্দার হকের মধ্যে পিতামাতার হক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন কারিমের একাধিক জায়গায় পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এক জায়গায় আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেনঃ আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সাথে কাউকে শরিক করো না। আর পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।অপর এক জায়গায় এরশাদ করেছেনঃ আর আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছি।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ বর্ণনা করেন, একদা আমি রাসূলে করিম সাঃ-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম,আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অধিক পছন্দনীয় আমল কোন্‌টি? উত্তরে তিনি বললেন, সময়মতো নামাজ আদায় করা। অতঃপর জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন্‌ আমল সবচেয়ে পছন্দনীয়? তিনি বললেন, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন্‌ আমল সবচেয়ে পছন্দনীয়? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। (বুখারি ও মুসলিম)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাঃ বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলে করিম সাঃ-এর কাছে এসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জিহাদে অংশগ্রহণ করার বাসনা প্রকাশ করল। রাসূলে করিম সাঃ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতামাতা জীবিত আছেন কি? সে বলল, জি হঁ্যা, উভয়ই জীবিত আছেন। তখন রাসূলে করিম সাঃ বললেন, যাও,তাদের ভালো করে খেদমত করো। অপর এক বর্ণনা মতে, তাদের খেদমত করে জিহাদ করো। (বুখারি ও মুসলিম)।

উপরিউক্ত হাদিসগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, জিহাদ ফরজে আইন প্রত্যেকের ওপর বাধ্যতামূলক না হলেও পিতামাতার সেবায় নিয়োজিত থাকা জিহাদের চেয়ে উত্তম। হজরত ওয়াইস করনি রহঃ-এর ঘটনা অনেকেই জানেন। তিনি ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। রাসূলে করিম সাঃ-এর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য তিনি অতি উৎসুক ছিলেন। কিন্তু মায়ের সেবার প্রয়োজনে তিনি রাসূলে করিম সাঃ-এর জিয়ারত লাভ করতে পারেননি। কিন্তু আল্লাহতায়ালা মায়ের খেদমত ও সেবার বদৌলতে তাকে এত বড় মর্যাদা দান করেছিলেন যে, বিশিষ্ট সাহাবাগণও তার মাধ্যমে দোয়া করতেন। হজরত উমর ফারুক রাঃ যখন মদিনায় আগমন করেছিলেন তখন তিনি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ এবং তার কাছ থেকে দোয়া নেয়ার জন্য তার কাছে উপস্থিত হন।

পিতামাতার সেবা করা তেমন কোনো মুশকিল বিষয় নয়। কেননা স্বভাবগতভাবে পিতামাতার প্রতি মানুষের যে অকপট ভালোবাসা থাকে তার দরুন সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সেবা করতে প্রস্তুত থাকে। অপর দিকে তারাও অতিশয় স্নেহ-মমতার ফলে সন্তান দ্বারা কোনো কষ্টকর খেদমত ও সেবা নিতে চান না। বরং সামান্য একটু খেদমতের বিনিময়েই বিরাট দোয়া করে থাকেন। অধিকন্তু করুণাময় আল্লাহতায়ালা এ কাজটি এত সহজ করে দিয়েছেন যে, মহব্বতের সাথে পিতামাতার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করলে এক হজ ও ওমরার সমান সওয়াব লাভ হয়ে যায়। মাতাপিতার সেবা করে মানুষ স্বীয় আমলনামায় রাশি রাশি সওয়াব সঞ্চয় করতে পারে।

রাসূলে করিম সাঃ বলেছেন, ওই ব্যক্তি লাঞ্ছিত হোক, ওই ব্যক্তি লাঞ্ছিত হোক, ওই ব্যক্তি লাঞ্ছিত হোক যে পিতামাতার কোনো একজনকে অথবা উভয়কে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছে তার পরও জান্নাতে যেতে পারেনি (মুসলিম)। অর্থাৎ পিতামাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়ে তাদের সেবা করে জান্নাতের ভাগী হওয়া কোনো মুশকিল বিষয় ছিল না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে এ দিকে ভ্রূক্ষেপ করেনি। অতএব সে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ারই যোগ্য।

পিতামাতার মধ্যেও মায়ের হক সবচেয়ে বেশি। হজরত আবু হুরায়রা রাঃ বর্ণনা করেন, কোনো এক দিন এক ব্যক্তি রাসূলে করিমের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকারী কে? উত্তরে তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞেস করলে রাসূলে করিম সাঃ বললেন, তোমার মা। এভাবে সে তিনবার জিজ্ঞেস করল। প্রত্যেকবারই তিনি উত্তরে বললেন, তোমার মা। চতুর্থবার যখন জিজ্ঞেস করলেন, তখন বললেন,তোমার পিতা (বুখারি ও মুসলিম)।

উপরোল্লিখিত হাদিসের পরিপ্রেক্ষিতে আলেমরা বলেন, মায়ের হক পিতার তুলনায় তিন গুণ বেশি। এর কারণও রয়েছে,মাতা সন্তানের জন্য যে কষ্ট ভোগ করেন, পিতা তা ভোগ করেন না। কুরআন কারিমে মায়ের কষ্টের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকন্তু মা খেদমতের অধিক মুখাপেক্ষী। তাই আল্লাহতায়ালা মায়ের সেবার প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

পিতামাতার সেবা সর্বাবস্থায়ই অপরিহার্য কর্তব্য। কিন্তু যখন তারা বার্ধক্যে উপনীত হন তখন এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কুরআন কারিমে অতি গুরুত্ব সহকারে এ দায়িত্বের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আর তোমার প্রতিপালক এ আদেশ করছেন যে, ‘তোমরা একমাত্র তারই ইবাদত করো এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।যদি তোমার সামনে তাদের মধ্য হতে কোনো একজন অথবা উভয়ই বার্ধক্যে উপনীত হয়ে যায়, তখন তাদের উহু পর্যন্ত বলো না অথবা ধমকি দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে কথা বলো। আর তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে তাদের সামনে নিজেকে তুচ্ছ করে রাখো এবং এ দোয়া করোহে প্রতিপালক! আপনি তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছে।

বার্ধক্যাবস্থায় পিতামাতার খেদমতের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করার কারণ হলো এ অবস্থায় তারা সন্তান-সন্ততির আর্থিক ও কায়িক উপকার সাধন করতে সক্ষম থাকেন না। তাই কোনো স্বার্থপর ও পাষাণ হৃদয় সন্তান এহেন নাজুক অবস্থায় তাদের অসহায় ও নিঃসঙ্গ করে ফেলে রাখে। এমনিভাবে বার্ধক্যাবস্থায় মেজাজও খিটখিটে হয়ে যায়,যা সহ্য করা কষ্টকর হয়। তাই আল্লাহতায়ালা তাদের স্নেহ-মমতা, ছোটকালে লালন-পালনের কষ্ট ভোগ, বিশেষ করে গর্ভধারণকালে মায়ের অসাধারণ কষ্টের কথা স্মরণ করে তাদের অপারগতা ও অক্ষমতার নাজুক সময়ে অনুরূপভাবে তাদের প্রতি সদয় হওয়া এবং ঐকান্তিকভাবে তাদের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন।

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ডিসেম্বর 7, 2010 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: