RSS

মুমিনের আচরণে সৌজন্য সদাচার

01 Feb

ব্যবহার মানব জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য উপাদান। মানুষের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার ও ইসলামী শরীয়াহ পরিপালন পরস্পর সহধর্মী। একটিকে ছাড়া অন্যটির কথা চিন্তাও করা যায় না। তাই সবাইকে অবশ্যই ইসলামী শরিয়ার আলোকে চরিত্র গঠন করতে হবে। আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে জগতের সব মানুষ আমাদের কাছে সর্বোত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকার রাখেন। ইসলামে সুন্দর ব্যবহারকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। জনগণের প্রতি ভালো ব্যবহার আমাদের জীবনের অন্যতম ব্রত হওয়া উচিত। হাসিমুখে ও আন্তরিকতার সঙ্গে সবাইকে গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্ব। মানব সেবার গুণ দ্রুত ও ইতিবাচক সেবাদানের মানসিকতা থাকতে হয়। তাই অবৈধ ও অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। ইসলামী জীবনাচার, আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার নিজের জীবনে পরিপালন করতে হবে।

ইসলাম কী? একজন জিজ্ঞেস করলেন। মুহাম্মদ (সা.) বললেন, পবিত্র বচন ও পরের জন্য জীবন। যে হৃদয়ে মানুষের জন্য প্রেম, ভালোবাসা ও সহানুভূতি নেই, সমব্যথা নেই, সে দিলের জন্য জান্নাত নেই। পরিপাটি হয়ে থাকা, সালাম ও পরিচয় দেয়া, সহযোগিতামূলক আচরণ করা, সৌজন্য বজায় রাখা, পরিমিত আহার করা এবং অনুমতি নিয়ে কথা বলা ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ইসলামে শিষ্টাচার বা আদবকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। ইসলাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং জীবনযাপনের বিভিন্ন পর্যায়ে সর্বজনীন শিষ্টাচার বা আদব-কায়দার সাধারণ মূলনীতি অনুসরণের নির্দেশনা দিয়েছে। তাই সর্বপ্রথমে ইসলামের মিশন এবং ভিশন সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। ইসলাম একটি সেবার ধর্ম, অনুষ্ঠানসর্বস্বতাই যার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। আমরা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পদকে আমানত হিসেবে মনে করব। সর্বোত্তম মানবসেবা চালিয়ে যাওয়া আমাদের একটি দায়িত্ব। সে জন্য সেবাদানের ব্যাপারে আজকের মুমিনদের মধ্যে স্পিরিট সৃষ্টি করতে হবে। ইসলাম হলো একটি সেবা প্রদানকারী ইন্ডাস্ট্রির নাম। এ জন্য আমাদের প্রতিযোগিতামূলকভাবে, যোগ্যতার মাধ্যমে, দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে জীব-জগতের সেবা প্রদান করা উচিত। সর্বোত্তম ব্যবহার, বিনয়ী চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, আনুগত্য, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুসম্পর্কের মাধ্যমে সেবাদান নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে সদা সচেতন থাকা উচিত। সে-ই সবচেয়ে ভালো মুসলমান, যার স্বভাব আপন পরিবারের কাছে সবচেয়ে ভালো বলে বিবেচিত। সে-ই পূর্ণ মুসলমান যার আচরণ সর্বোত্তম। যে ব্যক্তি নিজের লেনদেন ও কাজ-কারবারে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত এবং ওয়াদা পালন করে, দায়িত্ব পালন করে, মানুষকে ধোঁকা না দেয়, আমানতের খেয়ানত করে না, মানুষের হক নষ্ট করে না, ওজনে কম দেয় না, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং সুদ-ঘুষসহ যাবতীয় অবৈধ রোজগার থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলে, সে-ই হলো প্রকৃত মুসলমান।

সালামের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। খুশি মনে সালামের জবাব দেয়া সবার কর্তব্য। পরিচিত অপরিচিত সবাইকে সালাম দিতে হবে। সুযোগ পেলে মুসাফাহা করতে হবে। অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করে পরিবারের লোকদেরও খোঁজখবর নেয়া যেতে পারে। মানুষকে আমাদের সর্বোত্তম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে সব সময় হাসিমুখে কথা বলতে হবে। রাসুল (সা.) সব সময় মানুষের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলতেন। সুতরাং বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দ্বারা আগতকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। একজন হাস্যোজ্জ্বল মানুষের সঙ্গে যে কেউ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর কাছে আরজ করলেন, আপনি আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেন, তুমি রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার তা আরজ করলে নবী করিম (সা.) প্রত্যেকবারই বললেন, রাগ করো না।’ আমাদের সমাজে একটি কথার প্রচলন করা যেতে পারে—রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।
পৃথিবীতে যত আদর্শ প্রচারিত হয়েছে তা হয়েছে সুন্দর কথা দিয়েই, অসুন্দর কথা ও কুবচন দিয়ে কোনো আদর্শ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুন্দর কথা দিয়ে সহজেই মানুষের মন জয় করা যায়। শ্রেষ্ঠ মনীষীরা সুভাষী ছিলেন। সুন্দর কথার হাত, পা ও জীবন আছে। সুন্দর কথায় রোগ জীবাণু ধ্বংসের ওষুধ আছে, এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা আছে। সুন্দর কথায় শর্করার শক্তি আছে, ভিটামিনের সঞ্জীবনী আছে, আমিষের পুষ্টিগুণ আছে। একটি সুন্দর কথা ভালো গাছের মতো, মাটিতে যার বদ্ধমূল শিকড়, আকাশে যার বিস্তৃত শাখা, যে গাছ অফুরন্ত ফল বিলিয়ে দেয়। শুদ্ধভাবে, গুছিয়ে ও সুস্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে হবে। বিপদে আপদে আশপাশের সবার খোঁজখবর নিতে হবে। বাড়িতে এলে সম্মানের সঙ্গে তাদের বসতে দিতে হবে এবং সুযোগমত উপযুক্ত আতিথেয়তাও করতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি যে দয়ার্দ্র, আল্লাহ তার প্রতি দয়ার হাত বাড়ান। মানুষের সেবা করলেই আল্লাহর সেবা করা হয়। পথের কাঁটা সরিয়ে দেয়াও ঈমানের অংশ। কেউ যদি তার ভাইয়ের অভাব মোচনের চেষ্টা করে সফল না হয় তবুও আল্লাহ তার গুনাহ মাফ কর দেবেন। মানুষের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে হবে তাদের বোধশক্তি অনুসারে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার উন্নতিতে সাহায্য পাবে তার চরিত্র অনুসারে। তোমাদের মধ্যে তারাই আল্লাহর রাসুলের সবচেয়ে প্রিয় ও পরকালে ঘনিষ্ঠতম, যারা শিষ্টাচারপরায়ণ আর তারা সবচেয়ে বড় শত্রু ও সবচেয়ে পর যারা বদমেজাজি। নম্রতা ও সৌজন্য সওয়াবের কাজ। প্রকৃত বিনয় সব সত্ গুণের অংশ। সদগুণ ও সত্যনিষ্ঠায় অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা সদা জাগ্রত রাখতে হবে। কথা হবে মাধুর্যপূর্ণ, সংক্ষিপ্ত, যথাযথ ও আপেক্ষিক। সৌজন্যের খাতিরে যেসব শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে—অনুগ্রহপূর্বক, আপনাকে ধন্যবাদ, দুঃখিত, আমাকে ক্ষমা করবেন, যদি কিছু মনে না করেন, আপনার কাছে কৃতজ্ঞ ইত্যাদি। জনসাধারণের সঙ্গে এমন আচরণ করা যাবে না যার ফলে ইসলামী আদর্শের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বিবাদে জড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। অবাধ্যতা পরিহার করতে হবে, গুজব ছড়ানো যাবে না ও অমার্জিত ভাষায় কথা বলা যাবে না। কথা না বলার মানসিকতা, হিংসা, ঘৃণা পোষণ, অশুভ কামনা, নিন্দা করা, কপটতা ও স্থিরতার অভাব, উেকাচ ও উপহার ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।

হজরত মাসরুক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন—তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক উত্তম ওই ব্যক্তি, যিনি স্বভাবে সর্বোত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বভাবে অশালীন ছিলেন না এবং অনিচ্ছাকৃতও অশালীন উক্তি করতেন না। কোনো মানুষ ভুলবশত কোনো কাজ করে ফেললেও তাকে সামনাসামনি তিরস্কার করা যাবে না। সময়ের কাজ যথাসময়ে করতে হবে।

 
১ টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন ফেব্রুয়ারি 1, 2011 in ইসলাম

 

One response to “মুমিনের আচরণে সৌজন্য সদাচার

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: