RSS

আখেরি চাহার সোম্বা

11 Feb

আল্লাহর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ সাঃ এই পৃথিবীতে তেষট্টি বছর হায়াত পেয়েছিলেন। এর মধ্যে কখনোই তিনি বড় ধরনের কোনো রোগব্যাধির কবলে পড়েননি। কাফির মুশরিকদের শত অত্যাচার ও নির্যাতনের মাঝেও তিনি ছিলেন হিমাদ্রির মতো অবিচল। শেষ পর্যন্ত ইন্তেকালের আগে তিনি রোগে আক্রান্ত হলেন। উম্মুল মুমিনিনরা ও সাহাবা আজমাইনরা তাতে খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি আয়েশা সিদ্দিকা রাঃকে ডেকে বললেন, বিবি আমার কাছে আসুন ও আমার কথা শুনুন। হজরত আয়েশা রাঃ দৌড়ে চলে এলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাঃ আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক; বলুন! আমাকে কী জন্য ডেকেছেন। মহানবী সাঃ বললেন, আয়েশা আমার মাথাব্যথা চলে যাচ্ছে এবং আমি সুস্থতা অনুভব করছি। আপনি হাসান, হোসাইন ও মা ফাতিমাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে আসেন। হজরত আয়েশা রাঃ তা-ই করলেন। এরপর রাসূল সাঃ-এর মাথায় পানি ঢাললেন। তাকে সুন্দরভাবে গোসল করালেন। এ খবর মদিনায় সব স্থানে ছাড়িয়ে পড়ল। অনেক সাহাবি এ খবর পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। কেউ বা দাসমুক্ত করে দিলেন। কেউ বা উট দান করলেন। কেউ বা বহু দান-সদকা করলেন। সাহাবিরাও অনেকে রাব্বুল আলামিনের কাছে শুকরিয়ার নামাজ ও দোয়া করলেন। এটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার। এ জন্য দিনটিকে আখেরি চাহার সোম্বা বলা হয়। আখেরি অর্থ শেষ আর চাহার সোম্বা হলো বুধবার। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রাসূল সাঃ-এর আগে তার পরম বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছানোর জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। একজন মুসাফির যেমন দূরবর্তী সফরে বের হওয়ার আগে সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়, সব কিছু গুছিয়ে নেয়। যা দেখে অনুভব করা যায়, উনি কোনো সফরে বের হবেন। ঠিক তদ্রূপ মহানবী সাঃ তাঁর ইন্তেকালের আগেই বিদায়যাত্রার প্রস্তুতি দেখে নিকটতম সাহাবিরা অনুভব করতে পেরেছিলেন, রাসূল সাঃ বোধ হয় আমাদের মাঝে আর বেশি দিন থাকবেন না।

উদাহরণস্বরূপ রাসূল সাঃ প্রত্যেক রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ পালন করতেন। প্রত্যেকবার রমজানে মহানবী সাঃ-এর কাছে জিব্রাইল আঃ আসতেন এবং একবার সমগ্র কুরআন শরিফ মহানবীকে শুনাতেন। আর মহানবী সাঃও সমগ্র কুরআন শরিফ জিব্রাইল আঃ-কে একবার শুনাতেন, কিন্তু ইন্তেকালের বছর জিব্রাইল আঃ রাসূল সাঃ-কে দুইবার শোনালেন। রাসূল সাঃও জিব্রাইল আঃ-কে দুইবার শোনালেন। এরপর বিদায় হজের ভাষণের মাঝে তিনি বললেন, আজকের দিন যে সময় তোমাদের মাঝে আমি একত্র হয়েছি। আর হয়তো তোমাদের মাঝে আমি এখানে একত্র হতে পারব না।

এ কথার মাধ্যমে তিনি তার বিদায়ের ইঙ্গিত দিলেন। এরপর তিনি যেন সবার কাছ থেকে একে একে বিদায় নিচ্ছিলেন। তিনি ওহুদের প্রান্তরে চলে গেলেন। সেখানে তার প্রাণপ্রিয় চাচা ইসলামের বীর সিপাহসালার হজরত আমির হামজা ও ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হওয়া ৭০ জন জান্নাতি সাহাবির কবর রয়েছে। রাসূল সাঃ তাদের কবর জিয়ারত করলেন। এরপর একদিন জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে চলে এলেন। এখানে কবরবাসীকে সম্বোধন করে বললেন­ হে মুমিন সম্প্রদায়ের আসল নিবাসের অধিবাসীগণ! আমি অতি শিগগিরই তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি।

মহানবী সাঃ কখনোই জামায়াত ছাড়া ফরজ নামাজ আদায় করেননি। যখন থেকে জামায়াতবদ্ধভাবে নামাজ ফরজ হয়েছে। সর্বশেষে যখন বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি ১৭ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে যেতে পারেননি। শেষ যে নামাজে গিয়েছেন, তখনকার অবস্থা ছিল অন্যান্য দিনের মতো­ হজরত বেলাল আজান দিলেন। কিছুক্ষণ পর বেলাল মহানবী সাঃ-কে এসে ডাক দিলেন রাসূল সাঃ জামায়াতের সময় হয়েছে। মহানবী সাঃ বললেন, আমি বোধ হয় একাকী জামায়াতে যেতে পারব না, তুমি কাউকে ডেকে নিয়ে এসো। তিনি হজরত আলী অথবা অন্য একজন সাহাবিকে নিয়ে এলেন। মহানবী সাঃ দু’জন সাহাবির কাঁধে ভর দিয়ে জামায়াতে চলে গেলেন। অসুস্থতার কারণে দাঁড়াতে পারছেন না। তিনি বসলেন। আর আবু বকরকে পাশে ডাকলেন। বেলালকে ইকামত দিতে বললেন। তখন মহানবী সাঃ বললেন­ হে আবু বকর! তুমি আমার অনুসরণে নামাজ পড়বে আর তোমরা সবাই আবু বকরের অনুসরণে নামাজ পড়বে। সেভাবেই শেষ হলো। এটা হলো জোহরের নামাজ। নামাজ শেষে রাসূল সাহাবিদের কিছু কথা বললেন, ‘তোমরা কেউ শিরকে লিপ্ত হবে না। বিদেশ থেকে আগত দূতদের সম্মান করবে। সাবধান আমার কবরকে তোমরা পূজা করবে না। কেননা নবী-রাসূলদের কবর পূজা করে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।’ এর পরের ওয়াক্ত অর্থাৎ আসরের ওয়াক্তের সময় এলো। বেলাল ডাক দিলেন। রাসূল সাঃ বললেন, বেলাল! আমি বোধ হয় আর জামায়াতে যেতে পারব না, তুমি আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বলো। যখন নামাজ চলছিল তখন রাসূল সাঃ আয়েশাকে বললেন­ আয়েশা! হুজরার পর্দাখানা একটু সরিয়ে দাও, আমি নামাজরত আমার সাহাবিদের কাতারগুলো একটু দেখতে চাই। আয়েশা পর্দা সরিয়ে দিলে মসজিদের মধ্যে রাসূল সাঃ-এর দৃষ্টি পড়ল। সাথে সাথেই মলিন চেহারাটা আলোকে উদ্ভাসিত হলো। আয়েশা রাঃ জিজ্ঞেস করলেন, প্রচণ্ড অসুস্থতার কারণে আপনার চেহারা মলিন, কিন্তু আপনি মসজিদের দিকে তাকাতেই আপনার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে গেল তার কারণ কী? মহানবী সাঃ বললেন, আমি দেখলাম আমার অবর্তমানে আমার সাহাবিরা নামাজে ব্যতিক্রম করেনি। ঠিক আমার মতো সুন্দর করে নামাজ পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে আমার হৃদয়কন্দরে আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হয়েছে। তাই আমার চেহারা আলোকিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার আসরের নামাজের পর থেকে আর মসজিদের জামায়াতে যেতে পারেননি। এরপর ধীরে ধীরে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গোটা মদিনা নগরী নীরব নিস্তব্ধ। সোমবার সুবহে সাদেকে বেলালের আজান নিস্তব্ধতা ভেঙে জাগিয়ে দিলো সবাইকে। রাসূল সাঃ ইশারায় ফজরের নামাজ আদায় করলেন। হজরত আয়েশা রাঃ বললেন, আমার হুজরার বাতি সে সময় নিভে গেল। মহানবী সাঃ-এর সব সম্পদ এই মহূর্তে এমনভাবে শেষ হলো যে, বাতি জ্বালানোর তেলটুকুও ছিল না। অর্থাৎ তার প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়ার আগেই আলোর প্রদীপ নিভে গেল। হজরত জিব্রাইল আঃ এসে বললেন­ হে রাসূল সাঃ! আপনাকে আল্লাহ সালাম দিয়েছেন। রাসূল সাঃ তখনই ধরাধাম থেকে চিরবিদায় নেবেন। মেয়ে ফাতিমা সে সময় খুব কাঁদছিলেন। মহানবী সাঃ ফাতিমাকে ডাক দিয়ে কী জানি বললেন। তার কান্না বন্ধ হয়ে গেল। হজরত আয়েশা রাঃ ফাতিমাকে ডেকে বললেন, তোমার আব্বা তোমার কানে কী বললেন, আর তোমার কান্না বন্ধ হয়ে গেল? ফাতিমা বললেন, আব্বাজান আমাকে বলেছেন মৃতুøর পর তাঁর পরিবারের সবার মধ্যে আগে তাঁর সাথে আমার দেখা হবে। এরপর মালাকুল মউত আজরাইল আঃ এলেন। আর একটু পরই জান কবজ হবে। জিব্রাইল আঃ জিজ্ঞেস করলেন­ ইয়া রাসূল সাঃ! আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে। মহানবী সাঃ বললেন হঁ্যা, মৃতুøর যন্ত্রণা খুবই কষ্টকর। জিব্রাইল আঃ বললেন, ইয়া রাসূল সাঃ আপনাকে পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে কম কষ্টে জান কবজ করা হচ্ছে। মহানবী সাঃ বললেন, আমার তো মনে হচ্ছে ওহুদ পাহাড়টি আমার বুকের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর রাসূল সাঃ আস্‌-সলাত! আস্‌-সলাত!! অমা মালাকাত আইমানুকুম। নামাজ! নামাজ!! তোমরা তোমাদের অধীনদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। এ কথা বলতে বলতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে গেলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ।

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন ফেব্রুয়ারি 11, 2011 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: