RSS

মানবজীবনে কুরআনের অবদান

03 Apr

পবিত্র কুরআন মানুষের জীবনে আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত, যা রমজান মাসের মহিমান্বিত লাইলাতুল কদরে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর ওপর নাজিল করা হয়েছে। কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি অবতীর্ণ সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ, যাতে মানবজীবনের সব সমস্যার সমাধান বর্ণনা করা হয়েছে। নাজিলের সময় থেকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি হলো মানুষের জন্য আল্লাহর একমাত্র বিধান। কুরআনে মানবজীবনের প্রতিটি বিষয়ে এমনভাবে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, মানুষ কোনোভাবেই এর বাস্তবতা ও সত্যতাকে অস্বীকার করতে পারবে না। স্রষ্টা, আসমান-জমিন, লাওহি-কলম, মানুষের ইহকাল-পরকাল, জন্ম-মৃতুø, মানবসৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং অপরাপর সৃষ্টি সম্পর্কে তত্ত্ব ও তথ্যসমৃদ্ধ এমন বর্ণনা কুরআন ভিন্ন অন্য গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায় না। কুরআন মানুষের সর্বপ্রকার জ্ঞানের চাহিদা পূরণ করে মানবজীবনকে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত করেছে। পবিত্র কুরআন হলো মানবজীবনের এমন বাস্তব চিত্রায়ন, যা আগে ঘটেছে, বর্তমানে ঘটছে এবং অনাগত ভবিষ্যতেও ঘটবে। মানবজাতির স্বভাব-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমন বাস্তব উচ্চারণ কেবল কুরআনই করেছে।

কুরআন নাজিলের আগে মানবজীবনঃ মহাগ্রন্থ আল কুরআন পৃথিবীতে অবতীর্ণ হওয়ার আগে যে ক’টি সভ্যতার প্রভাবে মানবজীবন সবচেয়ে বেশি প্রভাবান্বিত হয়েছিল তন্মন্ধে গ্রিক, পারস্য, চীন, ভারতীয় ও আরব সভ্যতা উল্লেখযোগ্য। এই সব সভ্যতার কোনো কোনোটি শুরুর দিকে মানবকল্যাণে অবদান রাখলেও সময়ের বিবর্তনে এর সবই মানুষকে ঠেলে দেয় জঘন্য এক বিকৃত এবং মানববিধ্বংসী জীবনাচারের দিকে। আমরা যদি এসব সভ্যতায় গড়ে ওঠা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি, ধর্মবিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাই, জীবনের প্রতিটি স্তরে এরা অজ্ঞতা এবং ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। মানবজাতি মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালার পরিবর্তে কল্পিত অসংখ্য দেব-দেবী, বানানো মূর্তি এবং প্রকৃতির অসংখ্য বিস্ময়কর জিনিসকে নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। অন্য দিকে মানুষের ব্যক্তি জীবনে এই সব সভ্যতার যে অবদান খুঁজে পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত ভয়াবহ ও অমানবিক। জাতির সবল ব্যক্তিরা দুর্বলদের নিজেদের দাস-দাসীতে পরিণত করে তাদের ওপর যথেচ্ছ নির্যাতন-নিষ্পেষণ চালিয়েছে। গোটা মানবজাতি ইন্দ্রিয় চর্চা এবং ভোগের উল্লাসে যে অনাচার আর বর্বরতায় ভেসে গিয়েছিল, তাতে দুনিয়া জাহান্নামের ভয়াবহ আবাসে পরিণত হয়ে উঠেছিল। মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভাজন করার মাধ্যমে মানবজাতির সম্মান ও মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল। নারীদের পুরুষের দাসীতে পরিণত করা হয়েছিল। বিশ্বময় তাদের শুধু যৌন সম্ভোগের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এমনি মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের হেদায়াতের জন্য নাজিল করেন মহাগ্রন্থ আল কুরআন।

মানবজীবনে কুরআনের অবদান

শ্রষ্টার পরিচয় প্রদানঃ স্রষ্টা হিসেবে মানুষের কল্পনাপ্রসূত অসংখ্য দেব-দেবীর অস্তিত্ব ও বানানো মূর্তিকে ভ্রান্ত অসার প্রমাণিত করে পবিত্র কুরআন মানবজাতিকে তার প্রকৃত স্রষ্টা আল্লাহর সন্ধান দিয়েছে। স্রষ্টা হিসেবে অদ্বিতীয় মহান আল্লাহর পরিচয় জানতে পারা মানবজীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর পরিচয় প্রদান করে পবিত্র কুরআন বলছে, ‘বলুন, তিনি আল্লাহ এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।’ (ইখলাস)। কুরআন আরো বলছে, ‘তিনি আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদত করো।’ (আনআমঃ ১০২)।

মানবজীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঘোষণাঃ দিকভ্রান্ত মানবজাতিকে জীবনের সঠিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারিত করে দিয়ে পবিত্র কুরআন বলছে, ‘আমি মানবজাতি ও জিনজাতিকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদত করার জন্য।’ (জারিয়াতঃ ৫৬)। মহান আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা মানবজীবনের একমাত্র ব্রত। কুরআন আরো বলছে, ‘সমস্ত প্রশংসা কেবল একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজাহানের প্রভু।’ (ফাতিহাঃ ১)। অন্য এক আয়াতে সুস্পষ্টভবে বলা হয়েছে, ‘আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি এবং আমার জীবন-মরণ বিশ্ব প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহর জন্য।’ (আনআমঃ ১৬২)।

মানবজাতিকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দানঃ পবিত্র কুরআন মানবজাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদায় সমাসীন করেছে। মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে মর্মে কুরআন ঘোষণা করছে, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম অবয়বে।’ (তীনঃ ৪)। সৃষ্টিজগতের সব কিছুর ওপর মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা ঘোষণা করে অন্যত্র পবিত্র কুরআন ইরশাদ করছে, ‘নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। আমি তাদের জলে ও স্থলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (বনি ইসরাঈলঃ ৭০)।

মানবজাতির সৃষ্টিতত্ত্ব প্রকাশঃ মানবজীবন কোনো দেব-দেবীর ইচ্ছা কিংবা আশীর্বাদের ফল নয়। কিংবা মানুষ শূন্য থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবিভূêত স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো জীবও নয়। মানুষ হলো মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির ক্রমবিকাশ এবং ক্রমোন্নয়ন ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ ফলশ্রুতি ‘আশরাফুল মাখলুকাত’। পবিত্র কুরআন পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মানবজাতির সৃষ্টিতত্ত্ব উন্মোচন করে মানুষের চিত্তে প্রশান্তি দান করেছে। কুরআন বলছে, ‘আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি। এরপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে হাড় সৃষ্টি করেছি। অতঃপর হাড়কে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি। অবশেষে তাকে এক নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়।’ (মুমিনুনঃ ১৪-১৫)।

মানবজীবন হলো পরীক্ষাগারঃ মানবজীবন হলো আখেরাতের পরীক্ষা কেন্দ্র। মানুষকে নানাবিধ পরীক্ষার মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনে কে আল্লাহর সঠিক এবং অনুগত বান্দাহ তা খুঁজে নেয়া হবে। প্রমাণ করে নেয়া হবে সত্যিকারার্থে কোন ব্যক্তি ঈমানদার এবং কে মুনাফিক। পবিত্র কুরআন বলছে, ‘আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা ঈমানদার এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন যারা মুনাফিক।’ (আনকাবুতঃ ১১)। পৃথিবীতে মানুষকে তাদের ঈমানের ব্যাপারে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। এই মর্মে আল কুরআন বলছে, ‘মানুষ কি মনে করে যে, তারা এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে, আমরা ঈমানদার। অথচ তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরও পরীক্ষা করেছি যারা তাদের আগে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।’ (আনকাবুতঃ ১-৩)।

মানবজীবনে সফলতা লাভের উপায়ঃ মানবজীবনে সফলতা লাভের উপায় বর্ণনা করে কুরআন বলছে, ‘অতঃপর তোমাদের কাছে যদি আমার কোনো হেদায়াত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হেদায়াত অনুসারে চলবে তার ওপর না কোনো ভয় আসবে। আর না তারা চিন্তিত হবে।’ (বাকারাঃ ৩৮)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, সৎ কাজ করেছে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং জাকাত দান করেছে, তাদের জন্য পুরস্কার তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে। তাদের কোনো শঙ্কা নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (বাকারাঃ ২৭৭)। সফল ব্যক্তিদের ব্যাপারে কুরআন আরো বলছে, ‘ওই সব লোক যারা নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দান করেছি, তা থেকে ব্যয় করে তারাই হলো সত্যিকার ঈমানদার। তাদের জন্য স্বীয় পরওয়ারদিগারের কাছে রয়েছে ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।’ (আনফালঃ ৩-৪)।

মানবজীবনে বিপর্যয়ের কারণ বর্ণনাঃ মানবজীবনে নানাবিধ সফলতার মধ্যে হঠাৎ করে বিপর্যয় নেমে আসে। আর মানুষ তখন তার জন্য আল্লাহকে দায়ী করে অনুতাপের সাথে বলতে থাকে­ হায় আল্লাহ! আমি কী এমন অপরাধ করলাম, যে জন্য তুমি আমাকে এমন বিপদে ফেলে দিলে? অথচ ওই বিপদের জন্য মানুষ নিজেই দায়ী। পবিত্র কুরআন বলছে, ‘তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদেরই কর্মের ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (আশ-শূরাঃ ৩০)। অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমার যে কল্যাণ হয়, তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর তোমার যে অকল্যাণ হয়, তা হয় তোমার নিজের কারণে।’ (নিসাঃ ৭৯)।

মানবজীবনের সর্বোত্তম পন্থা ও পর্যায় নির্দেশঃ পবিত্র কুরআন মানবজীবনের সর্বোত্তম পন্থা ও পর্যায় নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল কুরআন বলছে, ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (বাকারাহঃ ১৪৩)

পার্থিব মোহ থেকে সাবধানকরণঃ মানুষ যেন পার্থিব উপায়-উপকরণ দেখে বিমোহিত না হয় এবং আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে না যায়, সে জন্য মানুষকে কুরআন সতর্ক করে দিয়েছে। কুরআন বলছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয় তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’ (মুনাফিকুনঃ ৯)। পার্থিব জীবনকে ভোগবিলাসে নয়, বরং পরকালের পুঁজি আহরণের সুযোগ হিসেবে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করে কুরআন বলছে, ‘মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা।’ (হাশরঃ ১৮)।

ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের মধ্যে পার্থক্য ঘোষণাঃ পবিত্র কুরআন মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করে বলছে, ‘এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক বৈ তো কিছুই নয়। পরকালই প্রকৃত জীবন; যদি তারা বুঝত।’ (আনকাবুতঃ ৬৪)। ইহলৌকিক জীবনের অস্থায়িত্ব বর্ণনা করে কুরআন বলছে, ‘পার্থিব জীবন তো কেবল সাময়িক উপভোগের বস্তু, আর পরকাল হচ্ছে স্থায়ী বসবাসের গৃহ। যে মন্দ কর্ম করবে সে কেবল তার অনুরূপ প্রতিফল পাবে। আর যে মুমিন পুরুষ বা নারী মুমিন অবস্থায় সৎ কর্ম করে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেখানে তাদের বেহিসেবে রিজিক প্রদান করা হবে।’ (মুমিনঃ ৩৯-৪০)।

জীবন ও মৃতুø দানের উদ্দেশ্য বর্ণনাঃ মানুষকে জীবন দান এবং পরবর্তীকালে মৃতুø দান করার উদ্দেশ্য বর্ণনা করে পবিত্র কুরআন বলছে, ‘তিনি জীবন ও মৃতুø সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ?’ (মুলকঃ ২)। এ সম্পর্কে কুরআন আরো বলছে, ‘এবং অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও জীবনের ক্ষতি এবং ফল-ফসল নষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যধারণকারীদের যখন তারা বিপদে পড়ে তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। (বাকারাঃ ১৫৫-৫৬)।

মানবজীবনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘোষণাঃ মানবজীবনের চূড়ান্ত পরিণতির কথা বর্ণনা করে পবিত্র কুরআন বলছে, ‘তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে তোমাদের সবাইকে। আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তিনিই সৃষ্টি করেন প্রথমবার আবার পুনর্বার তৈরি করবেন তাদের বদলা দেয়ার জন্য। (ইউনূসঃ ৪)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘অতঃপর যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম এবং যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারা জাহান্নামে চিরকাল বসবাস করবে। আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে এবং তারা তাতে বীভৎস আকার ধারণ করবে।’ (মুমিনঃ ১০১-৪)।

মানবজীবনে উৎসাহের ফল্গুধারাঃ শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও জীবনের প্রতি মানুষ যেন উদাসীন হয়ে না পড়ে, সে জন্য কুরআন ভালো কাজের প্রতি মানুষকে উৎসাহ করে বলছে, ‘যে একটি ভালো কাজ করবে, সে তার দশগুণ পুরস্কার পাবে এবং যে একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।’ (আনআমঃ ১৬০)। শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে অনিচ্ছায় ঘটে যাওয়া কোনো অপরাধকে তাওবা দ্বারা ক্ষমা করে দেয়ার ঘোষণা প্রদান করে কুরআন বলছে, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে। অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে।’ (নিসাঃ ১৭)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (জুমারঃ ৫৪)।

নারী জাতির মর্যাদা পুনরুদ্ধারঃ কুরআন পৃথিবীর অবহেলিত, পদদলিত ও বঞ্চিত নারী জাতির সম্মান পুনরুদ্ধার করেছে। পুরুষের ওপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে কুরআন বলছে, ‘নারীদেরও তেমনি অধিকার আছে, যেমন পুরুষদের অধিকার আছে নারীদের ওপর।’ (বাকারাঃ ২২৮)। অন্য আয়াতে পুরুষদের নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ প্রদান করে কুরআন ইরশাদ করেছে, ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করে জীবন যাপন করবে।’ (নিসাঃ ১৯)। এ ছাড়া কুরআনের অসংখ্য আয়াতে নারীদের সম্মান ও অধিকারের ব্যাপারে বিশদ বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে।

মানব চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচনঃ পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে মানুষের স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। যেমন এক আয়াতে কুরআন বলছে, ‘যখন মানুষ কোনো বিপদ-মসিবতে নিমজ্জিত হয় তখন সে দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে এবং সর্বাবস্থায় আমাকে ডাকতে থাকে।’ (ইউনূসঃ ১২)। অন্যত্র পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এক দল লোক সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করো না। তারা বলে আমরা তো সংস্কার কাজ করছি। জেনে রাখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।’ (বাকারাঃ ১১)।

জ্ঞান সাধনা ও সত্যানুসন্ধানে কুরআনের আহ্বানঃ পৃথিবীতে উন্নতি সাধন এবং জীবনকে সার্থক ও ফলপ্রসূ করার নিমিত্তে পবিত্র কুরআন গোটা বিশ্ব মানবতাকে জ্ঞান সাধনা এবং সত্যানুসন্ধানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মানবজীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। বস্তুত কুরআনের প্রথম নির্দেশনাই হলো জ্ঞান আহরণ সম্পর্কিত। কুরআন বলছে, ‘পড়ো তোমার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে।’ (আলাকঃ ১-৩) অন্যত্র কুরআন বলছে, ‘পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টির অস্তিত্ব দান করেছেন।’ (আনকাবুতঃ ১৬৯)।

উপসংহারঃ স্বল্প পরিসরে মানবজীবনে কুরআনের অবদান মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআন এমন এক গ্রন্থ, যা মানবজাতির সব জিজ্ঞাসার অবসান ঘটিয়েছে। মানুষের জীবন সম্পর্কে কুরআনের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও পথনির্দেশনা মানবজাতিকে একটি সুনির্ধারিত জীবন পদ্ধতি অবলম্বনে উৎসাহিত করেছে। যে জীবন পথের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে মানবতা মুক্তি এবং শান্তির পথে পরিচালিত হতে পারে। মানবজীবনের সব সমস্যার সমাধান পবিত্র কুরআনে প্রদান করা হয়েছে। তাই মানবজীবনকে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে কুরআনের দিকনির্দেশনা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন এপ্রিল 3, 2011 in ইসলাম

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: